মঙ্গলবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১০

বিবর্ণ অপরাহ্নে...


তীব্র অবশানুভূতিতে নিস্তেজ হয়ে আসছে চিন্তার ধুম্রজাল। বয়ে চলেছি রক্তে এক নিদারুণ অস্থিরতা। ভাবনাগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পাশ কেটে চলে গেল এক্ষনি খুব পরিচিত একটি চেহারা কিন্তু নাম মনে করতে পারিনা। পেছনে তাকাই; কেউ নেই। হয়ত চোখের ভুল। আবার এগুতে থাকি। সামনে একটি কৃষ্ণচূড়া। সময়ের বার্ধক্যে নতশিরে  তার ছায়া দাঁড়িয়ে আছে পথ আগলে। ইচ্ছা করেই মাড়িয়ে যাই। আমার অত কষ্টের অনুভূতি নেই; আর তাই তা দিতে কখনও কুন্ঠা বোধ হয় না। হয়ত সে তা চায়নি। আর তাই একটু হেলে গেল সরসর শব্দে। দূরে চারিদিকে নাগরিক ব্যস্ততা; দুই-তিন আর চার চাকায় ঘোরাঘুরি করছে ভবিষ্যতের ভাবনাগুলো বিক্ষিপ্তভাবে। কি আশ্চর্য, ভাবনাগুলো অনেকটা একই ধাঁচের; কিন্তু বহিঃপ্রকাশ প্রতিটা আলাদা। তার স্বরূপ, প্রকৃতি, প্রয়োগ, প্রচেষ্টা...সবকিছুই। আমি কি ভাবনার জন্য এগুচ্ছি? জানি না, হয়তবা। 

মাত্র অপরাহ্নের শুরু। তাও যেন কেউ নেই আশপাশে, অন্ততঃ আমার। শুধু দেখি রাস্তায় কিছু শুকনো পাতা পড়ে আছে, মৃত। এবং এই অবস্থাতেও তাদের ছাড় দেয়নি কেউ। পিষে গেছে প্রতিবারই যতবার এই পথে গেছে। মৃত ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে আছে তাদের বিগত জীবনস্থলের দিকে উপরপানে। আচ্ছা, তারা কি এখনও স্বপ্ন দেখছে তা নিয়ে? যা প্রস্ফুটিত হবে তাদের বংশধরদের নিয়ে আসন্ন বসন্তে? তাও জানি না। ধুর ছাতা! মাথা আসলেই আউলায় গেছে। মানুষের জীবন আসলে কেমন হয়া উচিত? মহৎ? পবিত্র? সৎ? ভাল? খারাপ? আমি তো কোনটাই হয়ে উঠতে পারিনি এখন পর্যন্ত। তাহলে আমার জীবন কেমন? অমানুষিক! হাস্যকর লাগে নিজের কাছেই। সামাজিক শৃংখলে বুদ্ধির ব্যুৎপত্তি হওয়া থেকে শিখছি কিভাবে মহৎ হতে হয়, সমাজের সব কুসংস্কার আর ধর্মান্ধতা হাসিমুখে মেনে নিয়ে; কিভাবে পবিত্র হতে হয়, অত্যাচারিত আর নিপীড়িত দের রক্তে জঞ্জাল সাফ করে; কিভাবে সৎ হতে হয়, মানুষের অন্ধবিশ্বাসকে পুঁজি করে। পুরোটা আয়ত্ত হয়নি। খারাপও হয়ে উঠতে পারিনি তাই বলে। খারাপেরও একটা নীতি থাকে; সুনির্দিষ্ট ছকে বাঁধা। আমার কোনো নীতিই নেই। আমি মুক্ত, স্বাধীন। নিজেকে দাবি করি একজন আধুনিকমনা-প্রগতিশীল; নিজের স্বার্থকে কেন্দ্র করে ঘুর্ণায়মান। আমার কোন আবেগ নেই, আর তাই প্রতিক্ষণ আমার কাটে উদ্‌বেগে। নিজের স্বার্থের ভয়ে। 

রাস্তাটা সামনে ঢালু হয়ে গেছে। দুইপাশে নাম না জানা শোভাবর্ধনকারী বৃক্ষরাজি। সূর্যের আলো তার ফাক গলে এসে পড়েছে রাস্তায়। দৃশ্যটা ভাল। তবে চোখ আটকে গেল সেই আলোতে। অসংখ্য ধূলিকণা সেই আলোর রাজ্যে ছোটাছুটি করছে। এই উন্মত্ত নাচানাচি দেখে হঠাৎ সাধ জাগল আমিও যাই। কিন্তু নাহ! আলোর কারণে হল না। আমাকে প্রকাশিত করে দিল তাদের সামনে। আমি দেখতে পেলাম শুধু আমার রৌদ্রস্নাত দেহ। সেখানে কোন ধূলিকণা নেই। শুধু আমি যেখানে নেই সেখানেই তারা খেলছে। আমার অনাহুত উপস্থিতি তাদের কাম্য নয়; শুধু তাদের নয়, হয়ত এ সময়েরও। চারিদিকে নজর বুলাই। সময়কে দেখার চেষ্টা করি। যেন থমকে গেছে। বিরস মুখে দেখছে অযাচিত আমার উদ্ভট কার্যকলাপ। কিন্তু আমি তো ওর কাছেই এসেছি। ওর কাছেই তো জমা আছে আমার সমগ্র চেতনা। আমি দেখতে চাই সেগুলো প্রাণভরে আরেকবার। কিন্তু সে আমায় সুযোগই দিতে চায় না। খালি খালি ভবিষ্যতের কাছে পাঠায়। সে তো জানে না ভবিষ্যত কোন চেতনা রাখেনা; রাখে শুধু সম্ভাবনা। যা অনির্দিষ্ট ও পরিবর্তনশীল। নিজের কাছেই তো আমি প্রতিনিয়ত অনির্দিষ্ট। তাই আমার ভবিষ্যত কাম্য নয়।

বামের লাল একতলা ঘরটা চোখে পড়ে। রোদের গরমে পুড়ে আরও লাল দেখাচ্ছে। এটাই কালো দেখাত যখন এরকম সময়েই আগে হাঁটতাম; শুধু সেই সময়ের পার্থক্য। পি. এম. এর জায়গায় এ. এম.; দিবার যায়গায় রাত্রি। রাতকে বরণ করতে কতই না বাহারি রূপ ধরতে হয়...আমাকে, তাকে, সব্বাইকে। অন্ধকার বলে কেউ যেন তার উপস্থিতিকে সামান্যতম অবহেলা না করে সে জন্যে প্রত্যেকের কি আপ্রাণ অপচেষ্টা। তারারা জ্বলতে জ্বলতে খসে পড়ে যায়। চাঁদ ঋণ পরিশোধ না করেই খরচ করতে থাকে সূর্যের কাছে থেকে ধার করা আলো। গাছগুলো আরো কালো হয়ে যায় যেন চোখে লাগে। কৃত্রিম আলোতে ধরা পড়ে মানুষগুলোর যান্ত্রিকতা; যেখানে কোনও স্থবিরতা নেই একমাত্র মৃত্যু ছাড়া। এমনকি ঘুমকেও তারা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়েছে, স্বপ্নসমেত হত্যা করে নিজের অজান্তেই। এ ঘরটার রঙ ও বদলে কালো হয়ে যেত রাতে। আসলে কি তাই? না আমার দৃষ্টির স্বরূপ বদলে যেত তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষায়? কি জানি? তবে ঘরটা তার কালো রূপ ধারণের সাথে আরও একটা কাজ করত যেন অন্তত আমি তাকে লক্ষ্য করি। তার আশ্রয়ে লালিত অসংখ্য ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকত সেই সময়ে যা এক অদ্ভুত তরংগজাল এর আবির্ভাব ঘটাত। আমি ক্ষনিকের জন্য হলেও মাঝে মাঝে বিভোর হয়ে যেতাম সেই মায়ার রহস্যে। পাদুটো দাঁড়িয়ে যায় এখন সেই মায়ার আশায়; অসময় জেনেও। সেই লাল এখন আর কালো হয় না, কালো হবার সময় নয়ও। প্রকৃতির সব কিছুই নিয়মমাফিক। সেখানে বৈচিত্রও প্রায়ই স্বনিয়মের অনুগত; তবে কল্পনাতীত, কল্পনামাফিক নয়।

সামনে এলোপাতাড়িভাবে হাঁটতে থাকি। ঐ যে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আসলে কি? আমার চেতনাস্থল না অতীত? বুঝতে পারিনা। শুধু কাঁটাতারটাই স্পষ্ট। বাকি সব ঝাপসা দেখছি। চেতনাস্থল হলে তো তার পাত্রপাত্রী থাকবে আরও। কিন্তু কেউ নেই সেখানে। আবার অতীত হলে তো আমার এখানে থাকার কথা না। ওদের সাথে থাকার কথা। আমি তবে এখানে কি করছি? না আবার মাথা ধরে আসছে। আর শুধু ঐ কাঁটাতার অমন করে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে কেন আমার দিকে? একেবারেই অস্বস্তিকর। হঠাৎ সব পরিস্কার হয়ে ওঠে। মনে হয় আমি বর্তমান, আমার লক্ষ্য অতীত কিন্তু গন্তব্য ভবিষ্যত। কিন্তু ঐ কাঁটাতার আমার ভাবনায় আবার জট পাকিয়ে তোলে।  নাহ, আমাকে এর সমাধান বের করতেই হবে;সমাধান আদৌ না থাকলেও। আজ না হোক; আর একদিন। আমি শুরু করতে চাই, একদম শুরু থেকে, একেবারে একদম শুরু। যেখানে ভাবনা আর কল্পনা নিতান্তই স্বকীয়; সম্পূর্ণ অনন্য। নবজাতকের মত। তার অনুভূতির মত, যে সব কিছুই শুরু করে একান্ত আপন অনুভূতিতে, যদিও সে জানে না সে অনুভূতিগুলো কেমন। কিংবা সেগুলো যে আদৌ অনুভূতি এই অনুভবই তার নেই। আর তাই একমাত্র সেই আস্বাদন করে তার প্রকৃত স্বাদ। আমার চারপাশে আমারই মত কত ভাবনা। আমার মত সবাই সেই ধাপ পার হয়ে এসেছি। কিন্তু যদি বলি যে একজন সদ্যজাত নবজাতকের অনুভূতিগুলো ভাষায় লিখতে কিংবা বলে বোঝাতে; কেউ কি পারবে? অন্ততঃ এইটা আমি নিশ্চিত জানি যে কেউ পারবে না, আমিও না। উলটো ঘুরি। ফেরত আসতে থাকি। এক্ষনে ছায়ার প্রতিবিম্ব আমার পেছনে পড়ে যায়। এবার আমি আগে চলতে থাকি। যাওয়ার সময় সে ছিল আমার আগে।

কোন মন্তব্য নেই: