শুধু তিনদিনের একটা ট্যুরেই পারভেজের কপালে জুটে গেল নামকরা দুটো ডিগ্রী। কপাল বটে, যেখানে পাঁচ বছরে টেনেহিঁচড়ে বুয়েট থেকে একটি ডিগ্রী নিতে পারভেজের কদু-টাইপ ভুড়ি এখন পূর্ণ যৌবনে বিকশিত কলসী টাইপে; সেখানে আদনান-রকিব-পারভেজ-শোয়েব-সুমন এর ডিসিশন মেকিং পঞ্চায়েৎ এর এবরশন করে বের করা একটি জমজ ট্যুরের কল্যাণে মাত্র তিন দিনে সে পেয়ে গেল দুদুটো টাইটেল। সুইং মাস্টার (মতান্তরে শুইং মাশটার) এবং ডিল্ডো আসাদ। যার দৈর্ঘ্য ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত। বিনিময়ে সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে আদনানের ক্যামেরা থেকে গেল সেখানে অফেরতযোগ্য; পারভেজের বদান্যতায়। পারভেজ নাকি “মামা” কেও ছাড়িয়ে গেছে! অবিশ্বাস্য!!! শোকে-ক্ষোভে কিংবা বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পারভেজ তার কুন্ডলী বের করেছে আজ পত্রিকায়, দেখে আজ তার অর্থভাগ্য বিশেষ শুভ। জিজ্ঞাসা করলাম তবে মন উদাস ক্যান?? বলল আদনানের হারানো ক্যামেরার জন্যে আজ তাকে ১৫হাজার টাকা দিতে হবে। কুন্ডলী আর উদাসীনতার জট ছড়াতে বললাম যে টেনশন করো না; তোমার অর্থেভাগ্যে মনে হয় আসলে বলা হয়েছে যে আজ তুমি ১৫হাজার টাকা নিঃশর্তে দেয়ার মত ক্যাপাবিলিটি অর্জন করবা, তাই অর্থভাগ্য শুভ। হুম, আসলে এভাবে ভাবিনি তো, আসলেই- উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল সে।
যাই হোক তার সেই উচ্চ মার্গীয় ডিগ্রীর নেপথ্যে শোনার জন্যে আমি, আদনান, রকিব তার সাথে রওনা দিলাম হাউজ বিল্ডিং থেকে অটো নামক এক সিএনজি আর রিকশার ক্রসপ্রোডাকশন এ ভর করে শর্মা হাউজের উদ্দেশ্যে। নামার পরে অবশ্য গন্তব্য উত্তরা বারো নম্বর না বালুর মাঠ নিয়ে চালকের সাথে কিছু টক শো চলল। আমি এর আগে যাই নি সেখানে, অতএব মানিব্যাগ এ হাত দেই টক শো তে না গিয়ে। তবে সেখানে দেখলাম রাস্তার একপাশ প্রায় পুরোটা জুড়ে ডাস্টবিনের রাজত্ব; শর্মা হাউজের অদূরেই। বারো বা বালু না মনে হয়; আসলে হয়ত জায়গাটা ভাগাড়, ভাবলাম। যাই হোক, আমাদের আদনান তার পাছাত্যাড়া হাটা আর নাসিকাবৃত বেনসনের কম্বিনেশনে শর্মার গেটের সামনে অচিরেই পারভেজের সুইং (শুইং) এর আদিবৃত্তান্ত আবিষ্কার করে ফেলল। আর তা হল শর্মা হাউজের এন্টিক্লকওয়াইজ (নিচ থেকে উপরের দিকে) সুইং খাওয়া সিড়ি! আমরা ধন্য ধন্য করলাম আর সুইং খাইলাম, এন্টিক্লকওয়াইজ। ফলাফল, দুটো জাম্বো বিফ বার্গার আর দুটো বিফ শর্মার অর্থবহুল অর্ডার। শুরু হল ডিগ্রীবৃত্তান্ত; আদনানের বাই ডিফল্ট মর্মস্পর্শী (?) ভাষণের তালে গিলতে লাগলাম ডাবলডেকার বার্গার। পারভেজের ডিল্ডোমি-সুইং এর কাহিনী আর বার্গারে মেশানো সসের সুইং মিলে আমার সারা মুখে, হাতে দিতে লাগল অনভ্যস্ততার রিভার্স সুইং! শালার এই জিনিস খাওয়ার মত এত বড় হাঁ আছে কোন আদমের বাচ্চার আমার জানার বড় শখ; নাইলে এত বড় বানায় ক্যান? আবার নাম দিছে জাম্বো। সেই ২০০৬ সাল থেকে প্রায়শই খাই। আজ পর্যন্ত ঠিকমত জুতসই করে খেতে পারলাম না। চেষ্টার কোনো কমতি না থাকার ফলশ্রুতিতে এখন চোয়ালের জয়েন্ট এ ফাটল ধরেছে, এমনকি চোয়ালও বেড়ে ঝুলে পড়েছে। কিন্তু আমার হাঁ এখনও জাম্বো হইতে পারে নি।
কাহিনী কেবল তখন শুরু হয়েছে মাত্র। আদনানের মুখে পারভেজের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার, কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই, কাপ্তাই থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে নরসিংদী......প্রভৃত বিধ্বংসী সব সুইং এর বর্ণনায় আমার মাথায় তখন কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে ঘোরের ইনসুইং-আউটসুইং। হাইজেনবার্গও মনে হয় এইবারে পারভেজের কাছে ফেল মারছে। আবার অর্ডার। রকিব আর আমি মিলে কফি; আদনান আর পারভেজ মিলে হট চকোলেট ড্রিংক। আবারও আদনানের অবিস্মরণীয় উদ্ভাবন। এবার অবশ্য সাথে সহকারী হিসেবে পারভেজ ছিল। আমি নতুন বিজ্ঞান জানলাম, হট চকোলেট ড্রিংক এর উপাদান হচ্ছে নসিলা আর কিছু উষ্ণ ফেনা!
তখনই এল সে। চোখ জুড়ানো এক নিষ্পাপ পবিত্রতা। আমরা বসেছিলাম দোতলায় দক্ষিণ দেয়াল ঘেঁষে। টাইলস এর মেঝে। ভেতরে বেশ বড় স্পেস, টেবিলের ফাঁকে ফাঁকে। তার মধ্যে ছুটে বেড়াতে দেখলাম হঠাৎ তাকে। আদনানই মনে হয় প্রথম দেখল তাকে। মা-সহ আরও কয়েকজন মহিলার সাথে এসেছে। একমনে ঘুরে বেড়াচ্ছে ইতস্তত। ফ্যাকাসে গোলাপী পোষাকে। বয়স মনে হয় তিন-চার হবে। এত্ত সুন্দর যে পিচ্চিটা তা বলে বোঝানো যাবে না। খালি পায়ে আস্তে আস্তে মেঝেতে পা দিচ্ছে আর হেটে বেড়াচ্ছে। টাইলস এর ঠান্ডা মেঝে। এই শীতে মনে হয় খালি পায়ে তাতে মজাদার কিছু পেয়েছে। একবার আমাদের টেবিলের পেছন দিয়ে গেল। রকিব হাই বলে হাত এগিয়ে দিয়েছিল। সে খেয়াল করে নি। হঠাৎ উলটা ঘুরে হাত দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সোজা মায়ের টেবিলে এক দৌড়। মজা পেলাম। হঠাৎ আমাদের চারজনের সব সুইং কেন্দ্রীভূত হয়ে গেল। একটু পর আবার এল। তবে দুই টেবিল পরের টেবিলে। ঠেস দিয়ে দাড়ালো। রকিব প্রথমে বলল নাম কি তোমার আপু? পরপর আদনান, পারভেজ আর আমিও জিজ্ঞাসা করলাম। প্রথমে কিছুক্ষণ মাথা নাড়িয়ে আর মুখ বাঁকিয়ে আমাদের পরখ করল, কিছু বলল না (মনে হয় ঈভ টীজার কিনা যাচাই করল)। এরপর হঠাৎ হাসিমুখে বলল তার নাম। কিন্তু বুঝলাম না। কাছে আসতে বললাম। এগিয়ে আসল। আবার বলল। এবারও বুঝলাম না। কি ব্যাপার? কানের প্রসেসর হ্যাং করল নাকি?? আবার জিজ্ঞাসা করলাম। এবার জানলাম- রাযনা।
শুরু হল স্বতস্ফুর্ত আলাপ। কি করে, কোন স্কুলে পড়ে, কোন ক্লাসে, আজকে কি পড়াইছে টিচার, কি কি কবিতা পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। সবটুকু না বুঝলেও জানলাম প্লেগ্রুপে-ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। কিছুক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলে আবার মায়ের টেবিল আর আশপাশ ঘুরে আসে, তিড়িং বিড়িং লাফাতে লাফাতে। আমাদের টেবিলে এসে কখনও সসের বোতলের মুখ, আবার কখনও সেভেন আপ এর বোতল নিয়ে টানাটানি শুরু করে। অনিন্দ্য সুন্দর লাগছিল তার এইসব কার্যকলাপ। সে কথা বলছে তবে সব কথা পরপর বলে না, তার সব কথা অবশ্য বুঝিও না; তবে মাথা ঠিকই সুইং দেয় বোঝার ভাবের। মাঝে মাঝে সে উত্তর দেয়- আম্মু। যেমন রকিব বলল একটা কবিতা বলতে। প্রথমে সে বলল- আম্মু। তারপরই ছুটে গেল মায়ের টেবিলে। উনারা আর এক কোণে বসেছেন বেশ দূরে। মায়ের কানের কাছে গিয়ে আমরা যাতে শুনতে না পাই এমনভাবে ফিসফিস করে কিছুক্ষণ আলাপ সেরে আবার চলে আসল। রকিব আবার বলল কবিতা বলতে। শুরু করল আস্তে আস্তে। ইংরেজি কবিতা। হতাশ! আমার কমন পড়ে নাই। তবুও শুনতে থাকলাম। তবে কথা এখনও আধোবোল তাই বুঝতে পারছিলাম না ঠিকমত। শুনতে আছি। হঠাৎ তীব্র কন্ঠের ঝাকুনি দিয়ে কবিতা শেষ! আরেকটা বলতে বলি। আবার শুরু। আবার ঝাকুনি দিয়ে শেষ। এরপর যে কবিতাই পড়তে লাগল, মাঝে মাঝে “আম্মু” আর ঝাকুনির অপেক্ষা ছাড়া আমার কিছু বোধগম্য হল না একমাত্র Twinkle Twinkle Little Star ছাড়া। আমি ইংরেজিতে আগে থেকেই গড়ের মাঠ। এবার বাংলা কবিতা পারে কিনা জিজ্ঞেস করি। বলে পারে না। বাংলা কবিতা শিখায় নাই এখনও টীচার। এমন একটা এনজেলের মুখে বাংলা একটা ছড়া শুনতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু নিজস্ব জং ধরা আর্কাইভ চুলচেরা খোঁজ দ্য সার্চ করে বহুকষ্টে আম পাতা জোড়া জোড়া কিংবা তালগাছ এনেও লাভ হল না।
রকিব আজ অফিস থেকে হ্যাপী নিউ ইয়ার (২০১১) এর কার্ড এনেছিল। আমাদের তিনজনকে দিয়েছে। আমাদের কফি পান শেষ তখন। হঠাৎ কার্ডের কথা মনে পড়ল। রকিবকে বললাম। জোশ বলে বের করল সে। কলম আছে কিনা জিজ্ঞাসা করল। আমি হ্যাঁ বলতে না বলতেই পারভেজ ছোঁ মেরে নিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। কে কার্ডে রাযনার নাম লিখবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব বেঁধে গেল আমাদের মধ্যে। সবাই লিখতে চাই; স্ট্রেট ফরোয়ার্ড; কোনো সুইং নাই। রাযনা তখন একটা কলামের পাশে হাটছে। ডাকলাম। রকিব জিজ্ঞাসা করল তোমার নামের স্পেলিং কি? জবাব আসল- আম্মু। এবং দৌড়। আবার কানাকানি আম্মুর সাথে। দৌড় দেখে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম সবাই। রকিব জিজ্ঞাসা করল “ঠিক কইছি তো? বানানের ইংরেজি তো স্পেলিং-ই নাকি?” নিশ্চিত হয়েও কিছুটা অনিশ্চিত ভাবে মাথায় সুইং দিলাম। কিছুপরে সে হেলেদুলে এসে যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে অবলীলায় বলল- “R-A-Z-N-A”। পরপর দুইবার শুনে নিশ্চিত হয়ে অবশেষে পারভেজ লিখল “ To RAZNA”। আমি লিখলাম “-ADIL, ADNAN, ROKIB, PARVEZ”। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম শুধু রাযনা, আর কিছু নেই। দুইবার মুখ থেকে শুনে জানলাম নামের শেষাংশ- অদ্রিকা। আবার বললাম অদ্রিকা মানে কি? –“আম্মু” এবং দৌড়। তারপর খুব সুন্দর একটা ভাব নিয়ে আস্তে আস্তে বলল “অদ্রিকা মানে স্বর্গীয় অপ্সরী”। বাহ! একেবারে খাপে খাপে মিলে গেছে। আমি পারভেজের লিখার পাশে যোগ করলাম “& Audrica”।
অদ্রিকা তখন আবার পাশের টেবিলে গিয়ে দাড়িয়েছে। রকিব বলল এদিকে আসো। তোমার জন্যে গিফট আছে। প্রথমে বুঝে নাই। উম?-বলল। আমি বললাম এইদিকে এসো। তোমার জন্যে গিফট আছে। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে। রকিব ওর হাতে দেয় ওটা। নিয়ে কিছুক্ষণ উল্টে-পাল্টে দেখল। মুখে খুশির ঝলক। তারপরই হাত উঁচু করে ধরে বলে-“আম্মু” এবং একদৌড়ে ছুটে যায়। আমাদেরও আর কিছু বলা হয় না। ঐপাশ থেকে ওর মা বলে থ্যাঙ্ক ইউ বল। সে তখন গিফট নিয়ে ব্যস্ত, সময় নাই। তারপরও বলে ওঠে আধোবোলে-থ্যাঙ্ক ইউ। ইতোমধ্যে আমাদের বিল দেয়া হয়ে গেছে। উঠে পড়ি। আমরা বাইবাই বলি অদ্রিকাকে। ওর মা ওকে বলে-আঙ্কেলদের বাইবাই বল। বলে কিনা আমি শুনতে পাই না, ততক্ষণে গেটের কাছে চলে গেছি। পেছন ফিরে তাকাতেও ইচ্ছা হয় না। অপার্থিব মায়ার স্বর্গীয় রূপ ফেলে আসার অবসাদে।
বাইরে এসে আবার অটো নিই। আমাদের আলাপে জুড়ে থাকে স্বর্গীয় অপ্সরী। সুইং ভুলে গেছি ততক্ষণে সবাই। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে এবার অটো সুইং খায়। ব্যাটারী শেষ! হাটা শুরু করি। রকিব বলে পিচ্চিটা এত্ত সুইট! পারভেজ আর আমি সাই দেই। পারভেজের ডিগ্রী আর শুভ অর্থভাগ্যের চাপ ততক্ষণে প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে পিচ্চির স্বর্গীয় প্রফুল্লতায়। আদনান এবার কয়- আমার যদি এমন পিচ্চি থাকে আর আমার বউএর সাথে বনিবনা না হয় তবে বউকে তালাক দেব কিন্তু পিচ্চি থাকবে আমার সাথে; মায়ের সাথে না। নির্ঘাত সুইং এর পূর্বাভাস। আমিও কিঞ্চিত সুইং খাই। বলি – খেয়াল করেছ? আমরা এতক্ষণ পিচ্চির তুলতুলে গাল টিপে আপু আপু করলাম; কিন্তু বের হওয়ার সময় বাইবাই খাইলাম আঙ্কেল হইয়া, তার মায়ের গুণে? তবে আর যাই হোক, অদ্রিকার আরোপিত মুগ্ধতা সরে না আমাদের কারো মুখ থেকে। চলতে থাকে য়্যাকশান রিপ্লে- অদ্রিকা-স্বর্গীয় অপ্সরী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন