শনিবার, ১ জানুয়ারি, ২০১১

ফেরারী ফিরে আসা


ভুল দেয়ালঘড়িতে ঘূর্নায়মান কাঁটার প্রতিটি প্রহরে সময়টা এগিয়ে যাচ্ছে গোধূলির আবহে। চারপাশ থেমে আছে এক অদ্ভুত শান্ত স্রোতে। আমি পাড়ে বসে আছি সে পুকুরের, যা আজ অপেক্ষার ক্লান্তিতে শ্যাওলায় ছেয়ে গেছে। একান্ত অপ্রাপ্তির অপেক্ষা। ঠিকা খাপ খায় না। সারা জগত জুড়ে যেখানে প্রাপ্তির হাহাকারে সৌন্দর্যমন্ডিত সেখানে একমাত্র এই পুকুরের নিয়মবহির্ভূত আচরণে অনেকেই বিস্মিত। শুধু আমি চেয়ে দেখি অপ্রাপ্তির ছায়াটাকে, প্রতিটি জলকণার সাথে মিশে আছে সেখানে। অজানা এক ভয়ে আশ্রয় নিয়েছে হালকা ঢেউগুলোতে।


অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি পোকাটাকে। একটা গোলমত কালো জিনিস নিয়ে ঠেলে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। আমার কিছু দূরেই। সিমেন্টের ব্লকের ঢাল, অনেকটাই মসৃণ। তাই অনেকখানিই বেগ পেতে হচ্ছে তাকে। হঠাৎ ফসকে গড়িয়ে নিচে চলে গেল কালোমতন বস্তুটা। কিন্তু বেশি নিচে গেল না। দুই ব্লকের মাঝখানের খাঁজে আটকে রইল। ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেল পোকাটা। ঠিক বুঝতে পারেনি কি ঘটল। একেবারে স্থির হয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎ হালকা বাতাসের তোড়ে কিংবা ভারসাম্য হারানোতে পড়ে গেছে বস্তুটা। পোকাটা কি করে দেখি ভাবলাম। আর তাই লক্ষ্য রাখতে লাগলাম। ইতস্তত ঘুরে বেড়াল এদিক ওদিক কিছুক্ষণ। তারপর ঠিকই আবার নিচের দিকে যাওয়া শুরু করল উপরে ওঠার পথ ধরেই। আশ্চর্য! 

আমি তার চলার পথে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর চোখ সরালাম। পুকুরের সবুজ পানিতে তীরের গাছগুলো নাচানাচি করছে। তবে বাতাসের বেগ কম থাকায় ঠিকমত নাচতেও পারছেনাআকাশটা পানির নিচে কেমন গাঢ় দেখায়। খুব একটা পার্থক্য নেই; শুধু নিচের আকাশটা বন্দী। অনেকটা মনে হয় আমার মত। এই আমি, নিচের আমি; আর আমার ভেতরে উপরের আমি। আর উপরের আকাশের মত ভেতরের আমিটা তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিচের আকাশটা বড়ই স্পর্শকাতর। সামান্য বাতাস বা ছোট্ট ঢিলের আঘাতেই বিকৃত হয়ে যায়। আমি ঢিল মারলাম কয়েকটা, নিজের বিকৃতি অনুধাবনের আশায়।

কখনও পরিবর্তন এগিয়ে যায়, ঘড়ির কাঁটার সাথে। কিন্তু সময়টা থেকে যায়। পরিবর্তন চিত্রে বৃদ্ধ হতে থাকে, সময়টা চিত্তে ঋদ্ধ হতে থাকে। আমার আমিকে কখনও তাই বর্তমানে খুজে পাইনা। হয়ত অতীতে নিজেকে অবলোকনে ব্যস্ত নতুবা ভবিষ্যতে কল্পনা গড়ায় ন্যস্ত। বর্তমানটা থাকে কোথায়? পুকুরের অপ্রাপ্তির সাথে? না, আমার দেয়ালঘড়িতে? এখানে আসার সময়ও তাকে দেখে এসেছি, নিরলস, ধ্রুব। সে আমার সাথে প্রায়ই এক মজার ধাঁধা খেলে, স্বপ্নে। আমি ঠিক করি একজনকে খুন করব। চরম নৃশংসভাবে। সে কে বা কোথায় আমি জানি না। কিন্তু ঠিকই তার কাছে পৌঁছে যাই। আমার সাথে কি অস্ত্র আছে তাও মনে করতে পারিনা বা দেখিনা। শুধু দেখি তাকে আমি হত্যা করতে গেছি এবং সে আমায় লক্ষ্য করেনি। তাকে আমি আঘাত করব এমন সময় হঠাৎ আমার সামনে ধরা পড়ে এই ঘড়ি। অবাক হয়ে দেখি তাকে সেই মুহূর্তে স্থির হয়ে যেতে। সে নষ্ট হয় না কিন্তু আমার কাজটা নষ্ট করে দেয়। আমি সময়হীনতায় আটকে যাই। ফেরত আসি হত্যা না করেই। ঘড়িই আমাকে নিয়ে আসে।

এই মুহূর্তে আমার একনিষ্ঠ শ্রোতা দুইজন। এই পুকুর আর আমি নিজে। অবশ্য পোকাটাকে লক্ষ্য করি আবার। এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখি ব্লকের খাঁজে পড়া বস্তুটা নিয়ে সে আবার উঠে আসছে উপরে। সেও হয়ত আমাকে শুনছে, আর শুনতে শুনতে আসছে বলে তার গতি কম।নিজের কাছে অস্বস্তি লাগে। কেন লাগে জানি না। পোকাটাকে অবাঞ্ছিত মনে হয় এই পরিবেশে। পুকুরের পাড় ঘেঁষে রাস্তা। দুইপাশ জুড়ে ঘাসের সবুজ অপ্রশস্ত আস্তরণ। মানুষ যাতায়াত করছে বাজার থেকে। পুকুরটা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে। আর আমায় দেখে হয়ত অবাক হচ্ছে এই উজবুকটা কোত্থেকে এল। এর কোনো কাম-কাজ নাই? হঠাৎ ঝোঁকের বশে একটা কাজ করে বসি। পোকাটার ঐ বস্তুটাকে আঙ্গুল দিয়ে ক্লিক করে ছুঁড়ে ফেলে দেই অকস্মাৎ। এবার আর ব্লকের খাজে পড়ে না; হারিয়ে যায়। আবার স্থির হয়ে যায় সে। বুঝতে চেষ্টা করে। আর আমি নির্বিকার হয়ে তার থেমে থাকা লক্ষ্য করি। 

তাকে অনেকটা আমার মতই দেখায়। কেন দেখায় তা ঠিক মাথায় আসে না। তবে একটা অনুভূতি ঘুরপাক খেতে শুরু করে। তার মত হয়ত আমিও আমার সবকিছু নিয়েই ছিলাম। এগুচ্ছিলাম সময়ের সাথে, সময়কে নিয়ে। নির্ভাবনায় এবং প্রশান্তির এক নিগূঢ় স্পর্শে। হঠাৎ মাঝখানে কোনো এক অজানা অসংগায়িত নিয়মে আমার কিছু হারিয়ে গেছে, চিরতরে। কিছু আছে হারানোর অপেক্ষায়। যার আশংকায় আমি এখন থমকে আছি একজায়গায়। এগুচ্ছি না আর। যদিও জানি, আমার এই থেমে থাকা কিংবা চলতে থাকার সাথে কিছুই যায় আসে না। আমি অসহায়, ভোরের শিশিরের মত। অসময়ে জন্ম বলে খুব কমেরই দৃষ্টিগোচর হয়। অন্যদের যখন সময় হয় তখন তার সব ফুরিয়ে যায়। তার কিছুই করার থাকে না। কিন্তু তারপরেও সে সকলের কাছে অপার্থিব, কল্পনার মত পরমসুন্দর।

ভাবনায় ছেদ পড়ে। অযথাই সেই অসময়ে আমার পাশে সারা দিনের অবসাদে ক্লান্ত কিছু ঘাসের দিকে লক্ষ্য করি। কোথাও যদি কোনো ব্যতিক্রম ঘটে, কিংবা একটু কোনোরকম সুযোগের অপশন আছে কিনা? এমনটি পাওয়ার আশায়। যাতে আমার সর্বস্ব নিয়েই আমি আমার সময়ের শেষ স্পন্দনটি অনুভব করতে পারি অথবা আমাকে দিয়েই হারানোর সূত্রপাত ঘটুক। তাহলে অন্তত এই থমকে যাওয়ার অসম্ভব ভয়াবহ চরম শূণ্যতা অনুভব করতে হবে না। সেই পোকাটার উপর আমার হঠাৎ সহানুভূতি জাগে তখন, যদিও এর পেছনের মূল হোতা আমি। সে তো একবারে সব হারিয়েছে। সে কি করছে এখন, কিভাবে এ পরিবেশে নিজেকে অনুভব করছে? নাকি শূণ্যতা কাটাতে আর একটা ঐরকম বস্তুর খোজে বেরিয়েছে। চোখ ঘুরিয়ে তাকাই। এবং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে লক্ষ্য করি, সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

কোন মন্তব্য নেই: