এককালে বাসার বুজুর্গদের বুলি শুনতে শুনতে প্রায় বলি হয়ে গিয়েছিলাম, “লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে। তাই গাড়ি-ঘোড়া চড়তে বেশি বেশি পড়ালেখা করো”। আমি মানি না, মানতাম না। কারণ জলজ্যান্ত চোখের সামনে দেখতাম, আব্বু তো কোনো পড়ালেখাই করে না। তাও দেখি দিব্যি রোজ ভুটভুট করে মোটরসাইকেল গাড়িতে করে অফিসে যায় আর আসে। আর বাসায় এসে শুধু আমার পিঠের চামড়া তোলার পাঁয়তারা খোজে। অবশ্য আব্বুকে কখনও ঘোড়ায় চড়তে দেখিনি আমি। তবে আমাকে মাঝে মাঝেই পড়ার সময় ঘোড়ার ডিম বলতে দেখেছি। তাই তখন মনে হতো আমার সাথে ঘোড়ার ডিম এর কোনো যোগসূত্র আছে বা থাকতে পারে। আর সেই ডিমটা ফুটে বাচ্চা হলেই আব্বু সে বাচ্চা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসবে।
সেই সময়কার সে বলি বাহাদুর লেখাপড়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে গলাধকরণ করে আজ অবধি বলির পাঁঠা হয়ে রাস্তা রাস্তা চষে বেড়াচ্ছে। ভাগ্যে ঘোড়া জুটে নাই, আর গণ পরিবহনে হয়ে গেছে বাদুড়ঝোলা। কয়েকবার অবশ্য শেষবারের মতো গাড়ির তলা দেখার সৌভাগ্য হতে হতেও ফাটা কপালের ফাঁক গলে বেঁচে গিয়েছি বলা যায়। আর এদিকে লেখাপড়াটাও যে পুরো বাগাতে পেরেছি তা না। হেঁচকি, বিষম আর ঢেকুর তুলে তুলে ক্রমাগত বাকি গুরুপাক অংশ বদহজমের অদম্য প্রচেষ্টা চলছে এখনও।
স্কুলে ভর্তি হতে না হতেই স্যারেরা কোঁৎ করে গিলিয়ে দিলো “জ্ঞানই আলো” আর “সুস্থ দেহে সুস্থ মন”। এইগুলো নাকি “মটো”। মটো আবার কী মাল একমাত্র আল্লাহ আর স্যারেরাই জানতো ঐসময়। আমার এন্টেনায় মোটরসাইকেল আর মটোরশুটি ব্যতীত মটো এর মতো আর কিছু ছিলো না। তো সেই জ্ঞানের আলোর ছটা দেখতে গিয়ে আমার দুরন্তপনাগুলো আস্তে আস্তে চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলো। অন্যদিকে সুস্থ দেহে সুস্থ মন বলতে স্কুলে ছিলো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নামক উদ্ভট কিছু তুঘলকি কান্ডের সমাহার। আমার মন তা দেখে ভয়ে ভোঁদৌড় দিলো আপন জগতে, গিয়েই খট করে খিলকপাট আটকে দিলো। এদিকে বাইরে থেকে মন হারিয়ে সুস্থ দেহ ত্রস্ত হয়ে, আর স্কুলের নিয়মের বেড়াজালে আটকে তড়পাতে লাগলো মাকড়শার শিকারের মতো।
প্লাস্টিকের একটা ফুটবল আর একটা ছোট টেনিসের বল ছাড়া আমার খেলার উপকরণ তেমন কিছু ছিলো না। কোত্থেকে জানি একটা লোহার চাকতি ঘূর্ণী পেয়েছিলাম। মাঝে স্ক্রু এর মতো একটা দন্ড ছিলো যেটা দুই আঙ্গুলে চেপে প্যাঁচ মারলেই বনবন করে ঘুরতে শুরু করতো। মসৃণ মেঝেতে শুয়ে শুয়ে আমি তাকে অহরহ চক্কর খাওয়াতাম। প্রায় দেড় থেকে দুই মিনিট অবধি ঘুরতো ঐটা। এসময় মেঝেতে কান পেতে রাখলে মিহিসুরে ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা যেতো একটা। দাদুবাড়ি থেকে এ পর্যন্ত আমরা দুইবার বাড়ি পরিবর্তন করলেও সেই ঘূর্ণীটা হারিয়ে যায়নি। কীভাবে কীভাবে যেনো সেটা থেকে যেতো সাথেই। এরকম আরেকটা ঘূর্ণী ছিলো পিটালি (আমরা বলতাম পিঠুলা) গাছের ফল। যখন গাছে ফল ধরত তখন আমি বা আমরাও কাজিনেরা ঢিল মেরে সেই ফল পাড়তাম। ফলটা দেখতে চ্যাপ্টা গোলাকার, অনেকটা চাকার গোল টায়ারের মতো। সেটার মাঝে নারকেলের খিল (মাঝের শক্ত শিরা) দিয়ে ফুটো করে ঘূর্ণী বানাতাম আমরা। এরপর চলতো প্রতিযোগিতা, কার ঘূর্ণী সবচেয়ে বেশিক্ষণ ঘোরে।
ছোটখালার বাসায় একবার বেড়াতে গিয়ে একটা প্লাস্টিকের ঘোড়া পেয়েছিলাম। আম্মুর কাছে শোনা রূপকথার ডালিমকুমারের ঘোড়া হয়ে উঠেছিলো সেটা একসময়। আর ভাঙ্গা বাল্বের গোড়া, কালি ফুরোনো কলম, চকের প্যাকেট এইগুলো নিয়ে সেই রাজ্যের প্রতিকৃতি গড়ে উঠতো। আর একটা ধনুক ছিলো (বাঁশের অংশ দিয়ে তৈরি), ছোটচাচা বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটা দিয়ে আমি ফড়িং ধরার চেষ্টা করতাম। আর মাঝে মাঝে আকাশে উড়োজাহাজ যেতে দেখলে সেই ধনুক দিয়ে তীর ছুড়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করতাম। আমার ছোড়া সে তীরগুলো ব্যর্থ হয়ে একটু পরে পরে টিনের চালে আর উঠোনে মুখ থুবড়ে পড়তো। একবার মনে হয় এই কাজ করতে গিয়ে বারান্দায় রাখা মাটির একটা কলসি ফাটিয়ে ফেলেছিলাম।
আব্বুর মোটরসাইকেলের পেছনের চাকার একটা পরিত্যক্ত টায়ার ছিলো বাড়িতে। সেটা ছিলো আমার গাড়ি। হাতে একটা মাঝারি সাইজের কাঠি, অনেকটা হ্যারি পটারের “ম্যাজিক ওয়ান্ড” এর মতো। ঐটা দিয়ে টায়ার গড়িয়ে নিয়ে চলতো আমার গাড়ি গাড়ি খেলা। ভ্রুম...ভ্রুউম...ভ্রুউউউম্মম্মম্ম করে মুখ দিয়ে শব্দ করে প্রায় বিদ্যুতগতিতে ছুটতাম আমার হোন্ডা নিয়ে। এরকম টায়ার আমার একারই ছিলো। যাদের সাথে খেলতাম, তাদের সবার ছিলো সাইকেলের পরিত্যক্ত রীম। আমাদের বাসার কিছু দূরেই গ্রামের প্রধান সড়ক, যেটা সাধারণ জমি থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচু লেভেল এ ছিলো। আমাদের কাজ ছিলো টায়ার গড়িয়ে সেই ঢাল বেয়ে রাস্তায় তোলা এবং আবার নেমে আসা। ওঠার সময় কষ্ট হলেও নামার সময়ে ব্রেক রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতাম প্রায় সবাই। রাস্তার ঢালের পাশে একটা ছোট্ট পুকুর ছিলো। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমার এবং আরও অনেকের গাড়ি প্রায়ই ডুব দিতে যেতো সে পুকুরে। আমার টায়ার হওয়াতে একটা সুবিধা ছিলো, তা ভেসে থাকতো। ফলে পড়লেও পানিতে না নেমে তুলতে পারতাম। কিন্তু অন্যদের পানিতে নেমে তুলতে হতো ডুবে যাওয়া রীম। এজন্যে কেউ কেউ আবার তার দিয়ে প্যাঁচ দেয়া কাঠি ব্যবহার করতো যেনো রীমকে আটকে ফেলা যায়।
হোন্ডার তেল ফুরিয়ে গেলে কিছুক্ষণ জিরোনোর জন্যে পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে ব্যাঙ-চিতরানো (আমাদের ভাষায়) খেলা শুরু করতাম আবার। ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ে থাকা পাতলা ইট কিংবা মাটির টুকরো দিয়ে পানিতে ছুঁড়ে ভাসিয়ে দিতাম। পুকুর তেমন বড় না হওয়ায় লাফাতে লাফাতে সেটা অন্য পাড়ে চলে যেতো প্রায়সময়। তখন ঐপাড়ে গিয়ে আবার এইপারে ছুঁড়ে মারা, এভাবেই চলতো আমাদের খেলা। কারটা কয় লাফে পার হলো সেটা গোনা হতো। অনেকসময় সেটা মাঝপথে গিয়ে টুপ করে ডুবে যেতো। সেটা ছোঁড়ার স্টাইলের ভুলে, কম শক্তিতে ছোঁড়ায় কিংবা টুকরোটা ক্ষয়ে যাবার কারণে হতো। ব্যাঙ এর মতো লাফ দিতো বলে আমরা একে ব্যাঙ চিতরানো খেলা বলতাম। আর সেই ব্যাঙ লাফ দিয়ে যাবার সময় ছলাৎ ছলাৎ কিংবা চ্রিৎচ্রিৎচ্রিৎ ধরনের শব্দ করতে করতে যেতো।
গাড়ি গাড়ি খেলা আরও কয়েক রকমের ছিলো। এর একটি নারকেলের ডাল দিয়ে। বাড়িতে দুটো বেশ বড় নারকেলের গাছ ছিলো। মাঝে মধ্যে বেশ জোরে বাতাস হলে দুই একটা মরে যাওয়া ডাল খসে পড়তো সেখান থেকে। সেটাকে ভ্যান বানিয়ে সেটার গোড়ায় বসতাম একজন, আরেকজন সামনের অংশ ধরে টানতো। টেনে হিচড়ে ছিলো সেটা আমাদের গাড়ির খেলা উঠোনে। তাছাড়া বছরে বিভিন্ন মেলা থেকে আব্বু কখনও ব্যাঙ-গাড়ি কিংবা ঘূর্ণী গাড়ি কিনে দিতো। ঐগুলো নিয়েও আমাদের খেলা চলতো।
যাইহোক, সেই খেলার টায়ার আর ধনুকটা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। কয়েকমাস আগে একবার বাসায় গিয়ে বাকিগুলো খুজলাম, পুরোনো কথা মনে পড়ায়। কিন্তু একটাও আর নেই। শুধু চাকতির ঘূর্ণিটা আছে। তবে মরচে পড়ে ভেঙ্গে গেছে।
বাসার কাছাকাছি বেশ কয়েকটা স্কুল আছে। পিচ্চিদের স্কুল। ঐটার পাশ দিয়ে বিকেলে হেঁটে আসার সময় প্রতিদিন দেখি দুপদাপ সব দঙ্গলেরা চেঁচামেচি করছে; স্কুল হয়তো ঐসময় ছুটি হয়েছে। বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো প্রত্যেকের কাঁধে নিজের চাইতেও বড় মাপের ব্যাগ। তা নিয়েও হৈ হল্লা আর ছোটাছুটিতে মত্ত। মাঝে মাঝে ধাক্কা লেগে যায় তাদের সাথে। স্যরি বলবো কী, তার আগেই উলটো নির্মল হাসিমুখে ফিরিয়ে দেয় ধাক্কার উপরিপাওনা। একদিন দেখি কোত্থেকে কয়েকজন একটা শুকনো নারকেলের ডাল পেয়েছে এবং তা টানাটানি করে গাড়ি গাড়ি খেলছে। আর তাদের গাড়ি ধরতে সঙ্গে আসা অভিভাবক চেঁচাতে চেঁচাতে পেছনে ছুটছে। তা দেখে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে যেতে থাকে সব। আমার সেই ছোট্ট “আমি” কোথায় কোন আড়াল থেকে ক্ষীনস্বরে ডাকতে থাকে আমায়। আমি খুজে পাই না, কখনও খুজে পাওয়া হয়ে ওঠে না আর। তবুও ঘোরে কিংবা ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে সেই ঘড়ঘড়, ভ্রুম...ভ্রুউম কিংবা চ্রিৎচ্রিৎচ্রিৎ আওয়াজ শুনতে থাকি। মাঝে মাঝে এত জীবন্ত লাগে, মনে হয় আমি সেই মেঝেতে কান পেতে আছি কিংবা ঢাল বেয়ে নামছি কিংবা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার আশেপাশে অস্পষ্ট বিচ্ছিন্ন আরও কিছু কোলাহল। শুধু ঘোর কেটে গেলে চোখ রগড়ে টের পাই, আমার জায়গায় আমাকে বদলে অন্য একটা কাউকে রেখে গেছে। আর সেই শোকে আমার ঐসব নাটাই ছেঁড়া ঘুড়িগুলো অভিমানে আকাশটাকে শূন্যতা বানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, চিরতরে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন