বৃহস্পতিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

শিশিরের মেঘমালা

ফাগুনের উঠতি দিনগুলো। এইসব কাকডাকা ভোর এখন বেশ আরাম লাগে। আধখানা দেহ লেপের নিচে মৃদু মৃদু উষ্ণতা নিয়ে, সেটার রেশ পুরো শরীরে ছড়িয়ে থাকে। ঘুমজড়ানো চোখে পশ্চিমের জানালার দিকে তাকাই। কখন আম্মু এসে সেটা খুলে দিয়ে গেছে টের পাইনি, প্রতিদিনের মতোই। ঝিরিঝিরি ভোরের বাতাসের ঝাপটা এসে ঢোকে একটু পরপর। জানালার ঐপাশেই একটি আমের বিশাল গাছ। বাইরে ধীরে ধীরে কেটে যাওয়া কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের ঘুম এখনো পুরো যায়নি। ছায়াঘেরা সেই ঘুমে ধূসর হয়ে আছে এখনো বাইরের পৃথিবী। ভোরের ঘুমের মতোই গাছটাকে জড়িয়ে তার ছায়া লেপ্টে আছে। ধীরে ধীরে খসে গিয়ে পাশের রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ার সময় তখনো হয়নি।


এলিয়ে থাকা দেহটাকে টেনে নিয়ে জানালার গ্রিলে ঠেস দিয়ে রাখি। হালকা বাতাসে আমগাছের পাতাগুলো নড়ছে সব একটু একটু।  দক্ষিণ দিকের মাঠে ঘাসগুলো শিশিরে ভিজে ঘন সবুজ আকার ধারণ করে আছে। মাঝেমাঝে কিছু নাম না জানা পাখির সম্মিলিত কিচিরমিচির ভেসে কানে আসছে। দেখার কৌতূহলে আম গাছের দিকে তাকাই ভালো করে। কিছু নজরে আসে না। তবে একটু পরে এক ঝাঁক পাখির দলকে ধূসর আকাশে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে উড়ে যেতে দেখা যায়। যতক্ষণ না তারা মেঘের মধ্যে মিলিয়ে যায়, একদৃষ্টে চেয়ে থাকি। জানালার কাছেই একটু পুরোনো ঝোপের মতো জায়গা। বেশ কিছু গুল্মু আর কচুগাছের জঙ্গলে ভর্তি। বড় বড় কচুর পাতাগুলোতে শিশির জমে মুক্তোর মতো হয়ে আছে। বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে পাতার উপরেই গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাতাসের জোর বেশি না হওয়াতে এবং ফোঁটাগুলোর আকার বেশি বড় না হওয়াতে পাতা বেয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে না তারা।

ঘরের এইপাশ থেকে বাইরের টিউবওয়েল চাপার শব্দ শোনা যায়। আম্মু হয়তো রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আব্বু কোথায় ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা। মনে হয় বাইরে পায়চারি করতে গেছেন। ফিরে এসেই অফিসের প্রস্তুতি আর আদরের দুলাল মানে আমার ঘুম ভাংলো কিনা সেটা নিয়ে হম্বিতম্বি শুরু হয়ে যাবে। বছরের শুরুর দিক। স্কুল শুরু হয়েছে, কিন্তু পড়াশুনার চাপ নেই। তাছাড়া স্যারেরা এখন বার্ষিক বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আর খেলাধূলার অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত। সেইসাথে আছে সামনের মাসে শুরু হওয়া বড় ভাইদের এস এস সি পরীক্ষার প্রস্তুতি। সামনের একমাস বিশাল ছুটি। আমার বন্ধুদের মনে এই নিয়ে ইতোমধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে গেছে। ছুটিতে কত্ত মজা হবে, কে কী করবে এই নিয়ে। সারাদিন খেলা কিংবা টই টই করে ঘুরে বেড়ানো, আরও কতকী। কোনো পড়ার ঝামেলা নাই, রোজ রোজ স্কুলে আসার বাধ্যবাধকতা নাই। ইশ, রোজ যদি এমন হতো।

স্কুল ছুটি হলে আমার ভালোও লাগে, আবার খারাপও লাগে। ভালো লাগে এই কারণে যে, পড়ার হাত থেকে একটু নিস্তার পাই। বাসায় আব্বু-আম্মুও তখন অত খবরদারি করে না। তবে আদর্শ ছেলের মতো সময় বেঁধে সকাল-সন্ধ্যা পড়তে বসতে হয় ঠিকই। আর খারাপ লাগে আমার সব কিম্ভুতকিমাকার উদ্ভট বন্ধুদের সাথে দৈনিক দেখা হবে না, এই মনোকষ্টে। যত পড়ার চাপ কিংবা কড়া অনুশাসনই থাক, আমার স্কুলের ক্লাস এর সময়গুলো খুব ভালো কাটে, সবার সাথে।

ক্লাসে আমার ট্যাগ হলো, একেবারে আদর্শ ভালো ছাত্র। ফি বছর পরীক্ষায় প্রথম কিংবা দ্বিতীয় স্থান বগলদাবা করে সবার প্রশংসা কুড়াই। সাথে আছে শাম্মি আর রেজাউল। প্রথম তিনটি স্থান আমাদের জন্যে একেবারে নির্ধারিত। শাম্মি অত্র এলাকার সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে ইতোমধ্যে নাম কুড়িয়েছে। চেহারার মধ্যেও বিশাল জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব। আর রেজাউল আমার মতোই হ্যাংলা-পাতলা। তার চেহারার মধ্যেই এমন কিছু আছে যে দেখলেই মনে হবে এই ছেলে পড়ুয়া আর বিজ্ঞ, আদতেও তাই।

আর এক আমি। ও হ্যাঁ, আমি ইমন। রোগাপটকা একটা ছেলে। আর মাথার চুল একেবারে সজারুর কাঁটার মতো খাড়া খাড়া। লোকে বলে, চুল খাড়া ছেলেরা নাকি ধুরন্ধর আর চঞ্চল প্রকৃতির হয় বেশি। আমি মনে হয় আসলে তাইও। কিন্তু আমার দাদা আর আব্বুর কারণে তেমন কিছু একটা করে উঠতে পারি না। এই স্কুলে আব্বুও পড়েছেন, ছিলেন একেবারে ফাটাফাটি ধরনের ছাত্র। আর দাদা নাকি এই স্কুলের সেইরকম ভয়ংকর ধরনের শিক্ষক ছিলেন। পুরা বংশগত পরম্পরায় চলছে আমার স্কুল। আর এই কারণে সবার আমার উপরে নজরদারি বেশি। যেদিকেই যাই, সবাই চেনে আমাকে। মহা মুসিবত। তার উপরে আবার আমি ক্লাস কাপ্তান। যার প্রধান প্রধান কাজ হচ্ছে স্যারের জন্যে বেত আর চক বয়ে নিয়ে আসা, টিফিন পিরিয়ডে সিঙ্গাড়ার বাক্স মাথায় নিয়ে বয়ে নিয়ে আসা, রোবোটের মতো রিডিং পড়া, আর ক্লাসগুলোর বিরতিতে যেনো কারো লেজ না গজায় সেদিকে খেয়াল রাখা। এই কারণে আমার সাথে মিশতে অনেকেই একটু কুণ্ঠা বোধ করে।

তাই যখন ক্লাসের ফাঁকে কখনোবা অন্যের লেজ না কেটে নিজের লেজ দেখাই, কিংবা সবার সাথে ঠা ঠা রোদের মধ্যে গোল্লাছুট আর দাঁড়িয়াবান্ধায় পুরো টিফিন পিরিয়ড মাঠে গড়াগড়ি খাই, সাইকেল নিয়ে প্রতিযোগিতায় ছুটি, পুকুরের ধারের গাছ থেকে ঢিল দিয়ে কাঁচা জাম্বুরা পেড়ে সেটা নিয়ে ফুটবলে মেতে উঠি; কেউ কেউ থতমত খেয়ে যায়। ঠিক যেনো খাপে যায় না। আদর্শকে এরকম বেহাল দশায় দেখে তাদের চোখ অভ্যস্ত না। স্যার আমাদের দিকে আঙ্গুল দিয়ে অন্যদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, ছাত্র হলে এরকম হতে হবে। সবাই তাই আমাদের ফলো করে। মাসুদ, নকীব, জাকির, দীপা, ডালিয়া, রুনু, সোহেল, পলাশ, নাজির, রীনা...সবাই, সবাই।

কিন্তু তার কি জানে আমার আদর্শ কে বা কারা? আমি যখন রিডিং পড়ি ক্লাসে, স্যার প্রায় সময়ই টেবিলে বসে ঝিমান। আমি আড়চোখে দেখি, পেছনে সোহেল ঘুমাচ্ছে কিংবা তুখোড় আড্ডায় মশগুল। আমার তখন খুব ইচ্ছে করে সোহেল হয়ে উঠতে। ইসমাইল স্যারের মতো ভয়ংকর স্যারের ক্লাসে যে এমন দুঃসাহস দেখাতে পারে, আমি ঠিক তার মতো হতে চাই। কিংবা ফুটবল মাঠে নাজির যখন দুর্দান্ত ড্রিবলিং এ প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে বুলেট গতিতে গোলে কিক করে, আমি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখি আর ভাবি, আমিও একদিন নাজিরের মতো স্ট্রাইকার হবো। ক্রিকেট মাঠে মাসুম নামের এই বিভ্রান্তিকর ছেলেটা পুরা দানবের মতো অমানবিকভাবে যখন ছয় বলে পাঁচ ছক্কা হাঁকায় এবং তার মধ্যে দুটো শটে বল হারিয়ে যায়, আমি কল্পনায় মাসুমের জায়গায় নিজেকে ভেবে আগামীর লারা হয়ে উঠি। পলাশ যখন দৌড়ে ইঁদুরের মতো সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়, ভাবি আমিও পলাশ এর মতো দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন হবো একদিন।

আলীম যখন বাগ্মীতার দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে আড্ডায় কিংবা বিতর্কে সবাইকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, আমি অবাক হয়ে তার উপস্থিত বুদ্ধির বৈচিত্র্য উপভোগ করি। রিপন যখন রাজার চরিত্রে পুরোদস্তুর টিপু সুলতান হয়ে ওঠে, আমি তাকে কুর্নিশ না করে পারি না। রীনা যখন অডিটোরিয়ামে গান আর নাচে সবাইকে ঘোরের মধ্যে মাতিয়ে তোলে, আমার কেনোজানি মনে হয় এই অদ্ভুত মেয়েটার কাছে আমার গান শিখতেই হবে। বাপ্পীর কাছে বিজ্ঞানের হরেক রকম নতুন জিনিসের খবর শুনে আমারও ইচ্ছা হয়, আমি তার মতো জ্ঞানের অধিকারী হই। আরেক পলাশ আছে আমার ক্লাসে। ওর অংকনের মুনশিয়ানা দেখলে যে কেউ পাগল হয়ে যাবে। আমি কল্পনার তুলিতে পলাশের হাত দিয়ে আমার স্বপ্নের রাজ্য গড়ি প্রায়ই। অথচ আমার এইসব অসাধারণ বন্ধুরা বোকার মতো বলে কিনা আমার মতো আদর্শ হতে চায়। ওরা কি জানে আমার দৈন্যতা? আমি যে কিছুই নই আসলে। আমি যে প্রত্যহ তাদের এক একজন হয়ে ওঠার অদম্য প্রত্যাশায় নিমজ্জিত থাকি তারা কি তা জানে?

ঢুলতে গিয়ে হঠাৎ হুঁশ ফিরে আসে। আব্বু ওঘর থেকে ডাকছে খেতে। স্কুলেও যাওয়ার সময় চলে এসেছে। আমি জানালা ছেড়ে চলে আসি। পাশের আমগাছের শরীর ছেড়ে ছায়াটা ততক্ষণে রাস্তায় নেমে পড়েছে।  
                                                         

কোন মন্তব্য নেই: