ক, খ, গ, ঘ এবং ঙ। পাঁচবন্ধু, এক্কেরে যাকে বলে জিগরি দোস্ত। এর মধ্যে প্রাণের টানটা জানের জান এর পর্যায়ে নিয়ে গেছে ঘ আর ঙ নিজেদের মধ্যে। মানে তারা নিজেদের মধ্যে ভালোবাসাবাসি করে, ভালো কোনো বাসা না পেলেও। ঘ কিছুটা শান্ত প্রকৃতির হলেও ঙ একেবারে মারদাঙ্গা জবড়জং। তাই নিজের নিম্নদেশে গজে ওঠা সদ্যজাত কুঁড়ির ন্যায় ভুড়ির পাশাপাশি নিত্য রঙ মেখে সঙ সাজা ঙ বুড়ির ঢং বাগে রাখতে ঘ কে হরহামেশাই গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এদিকে বাকি তিনজন আছে আপন আপন ধান্দায়। ক নাকি ইদানিং কবিতা লিখে বেশ নাম কুড়িয়েছে বলে শোনা যায়। হাবভাবে কিন্তু তেমননা। আপাত চোখে সে পুরাই বিশ্বপ্রেমিক। ক শুধুমাত্র তার শুঁড়ের সাথে ঝুলতে থাকা দাড়ির বহর দিয়েই শত রমণীর কলজে ফ্রাই করে কালাভুনা বানিয়ে তারিয়ে তারিয়ে খেয়ে ফেলেছে। অনেক উঠতি বয়সী বালিকা অকালে নারী হয়ে গেছে তার সংস্পর্শে এসে। এখন সে এক অস্ট্রেলিয়ান কলজের ধান্দায় দাঁতে না, হাতে শান দিচ্ছে নিয়মিত মোবাইলের বোতামে, তুমুল তুলকালাম ক্ষুদেবার্তায়। আর দাড়ির শান বাড়াতে সে আগে থেকেই দেশী ইউরিয়া ব্যবহার করে। এখন তার মাথার চুল ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগে কার্লি হয়ে গেছে। আগে কদুর তেল মাখা চুলের মতো লম্বা আর দীঘলকালো ছিলো।
খ আর গ এইদিক দিয়ে কিছুটা ভিন্ন প্রজাতির। খ একজন নামকরা ফটোগ্রাফার। যদিও তার ফটো এর চাইতে ফুটো এর প্রতি আগ্রহ অনেক বেশি, তা যে টাইপেরই হোকনা কেনো। তার শুড়ে যে অবতল জায়গা দেখা যাচ্ছে সেটা ক্যামেরা রাখার জায়গা। নিচে জায়গা নাই। উত্তল ভুড়ির উত্তাল টানে প্যান্ট তো দূরের কথা, এখন পশ্চাতদেশও ব্লাকহোলের মতো প্রবল আকর্ষণে ভুড়িতে ঢুকে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। ক্রমাগত হাগাহাগির মাধ্যমে সে এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া কোনোমতে ঠেকিয়ে রেখেছে। নইলে এদ্দিনে ভুড়ির নিচে শুধুমাত্র সরু দুইখানা ঠ্যাং ছাড়া কিছুই আস্ত থাকতো না তার। কিন্তু এনিয়ে তার তেমন মাথাব্যথাও নেই। মনের সুখে হেগে যাচ্ছে, এতেই পরম শান্তি। অন্যদিকে গ অনেকটা রাশভারি প্রকৃতির। সরকারি প্রকৌশলী। সেই ক্ষমতাবলে মুখে গুঁজে নিয়েছে প্রমাণ সাইজের একখানা জাঁদরেল মোচ। সেই মোগলাই মোচে সে প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুইবেলা সময় বেঁধে পাম অয়েল দিয়ে পোঁচ দেয়। সরিষা তেলে ইদানিং ভেজাল বেশি। তাই ব্যবহার করেনা। তাছাড়া যে রোদ পড়েছে এই সময়, পুড়ে যাতে রঙ নষ্ট না হয়ে যায় সেজন্যে সে একটা সানগ্লাসও বাগিয়ে নিয়েছে। নাকের বদলে সেটা এখন জনসমক্ষে ঝুলছে ঠোঁটের উপরে প্রায় সময়ই, সে একখান দেখার মতো জিনিস বটে।
এইখানে আর একজন আছে। অনিয়মিত। সে হলো চ। ক এর পুরনো দোস্ত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ক এর অন্যতম চতুর, চুলখাড়া, উড়নচন্ডী, চঞ্চল, চাপাবাজ, চরমন্থর, নিশাচর বন্ধু এই চ। একসঙ্গে হলে একই রুমে প্রায় তিন বছর কাটিয়েছে তারা। পরে ক তার দাড়ি, নারী, আর ক্ষুরধার লেখনীর বদৌলতে প্রগতিশীল সমাজে অনুপ্রবেশ করে। আর চ তার সমস্ত চিন্তা, চাহনি, চামবাজি বিকিয়ে এখন কামলা খাটে সরকারি আমলার। ক এর সাথে চ এর এখন যোগাযোগ অনেকটাই অনিয়মিত। তবু কোনোদিন শাহবাগে কোঞ্চিপায় আসলে চ এর দেখা হয় ক, খ, গ, ঘ আর ঙ এর সাথে। তাদের সাথে বসে তাদের আড্ডায় শরিক হয়। মাথা সাইজমতো থাকলেও যথেষ্ট মস্তক না থাকার কারণে সে খুব একটা কথা বলেনা। কেনোনা, এখানে বড়ো রকমের গুণীজন রয়েছেন। উলটাপালটা বললে পরে হয়তো দাড়ি, ভুড়ি, জবড়জং বুড়ি কিংবা রাঘবমোচের বাড়ি খেতে হবে। এই পাঁচজন বুদ্ধিজীবির প্রায় সবার সাথে চ এর ভালোভাবে বন্ধুত্ব হয়েছে জীবনের প্রথম সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে। সেই চর্চাপদের আদ্যপান্ত, চ এর অভিজ্ঞতার অতিরঞ্জিত অনধিকার চর্চার নিমিত্তেই এই লেখার অবতারণা।
এই ভ্রমণ সম্বন্ধে আসলে চ এর কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিলোনা। এপ্রিলের ২৯, ৩০ আর মে এর ১ তারিখ, যথাক্রমে শুক্র, শনি ও রবিবার, তিনদিনের মহাছুটি। চ এর ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিলো অন্য কিছু বন্ধুদের সাথে, জায়গা সুনির্দিষ্ট ছিলোনা। আদতে যাওয়া হবে কিনা সে নিয়েও সংশয় ছিলো। এরই মধ্যে হঠাৎ ২৬ তারিখে রাতে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে ক ফোন করে জানায় চ-কে যে, আমরা ২৮ তারিখ রাতে রওনা দিচ্ছি। চ প্রথমে ভ্যাবাচেকা খায় কী বলবে। একি প্রণয়ের ডাক, নাকি ক এর রুচি বদলে গেছে, নাকি ক মরে গেছে, নাকি ভোর হয়ে গেছে ১১PM এ? নাকি ফোনে রংনাম্বার? কেনোনা ক যে মোবাইলে প্রেম ছাড়া আর কিছু করে বা করতে পারে এই বিশ্বাস অনেক আগেই মুছে গেছে তার। যাইহোক ঘটনার আকস্মিকতায় আকপাক হারিয়ে চ বলে ফেলে, ওকে, যাচ্ছি। অন্য বন্ধুদের কথা জানাতে ভুলে যায়। পরে আবার ফোন দেয় সে ক-কে। ক জানায়, আমি একদিনে দশ বিড়ি খাইলেও এক বিড়ি দশ ফুঁকে খাইনা। টিকেট ফিক্সড। কথার মর্মার্থ না বুঝে “কী আছে, জীবনে আর। ঘুইরা আহি, পরে অগোরে এক প্যাকেট চানাচুর খাওয়ায় দিমুনে” ভাবে চ নিজমনে। বাক্স-পেটরা সাজতে থাকে লবণপানির স্বাদ আস্বাদনের স্বপ্নে।
রাত বারোটায় বাস, হানিফ এন্টারপ্রাইজের ভলভো। মতিঝিল থেকে। কথা ঠিক হয় একসাথে সবাই রওনা দেবে খ এর বাসা থেকে। প্রথমে চ চলে আসে ক এর বাসায়, সেখান থেকে পরে ঘ এর সাথে তারা চলে যায় খ এর বাসায়। সেখানে গ আগে থেকেই হাজির। শেষবারের মতো শান দিয়ে নিচ্ছে মোচে যাত্রার আগে। বেশ কিছুক্ষণ পরে আসে ঙ, নিজের প্রায় দ্বিগুণ সাইজের একটা ট্রাভেল ব্যাগ সমেত। দেখে সবার চক্ষু চড়কগাছ না পেয়ে দেয়াল বেয়ে খ এর বাসার ছাদে উঠার চেষ্টা করে তৎক্ষণাৎ। মাত্র দুইদিনের ট্যুর, অথচ সারা মাসের খোরাক নিয়ে আসছে নাকি? চ আর খ ভ্রু কুঁচকে সন্দেহ করে, ভাবী বন্ধুপত্নী এখনই হানিমুনের প্রস্তুতি নিয়ে আসছে নাকি? না বাসা থেকে পালিয়ে আসছে বিয়ে করার জন্যে? পরে ইভ টিজিং মানে ইভ সিজিং (seizing) টাইপের নারী কেলেংকারি হবে নাতো? ঘ এর মুখে ইতোমধ্যে সবকিছু হারানোর আশংকা ভর করেছে। সেই ব্যাগ টানতে টানতে তার চোখমুখ কাঁচুমাচু হয়ে যেতে দেখলো সবাই, ঙ ছাড়া। ঘ আরেট্টু হলে কেঁদেই দিতো, আমি বিয়া করুম না এহন।
ছয়জনে মিলে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালো সাড়ে এগারোটায়, সাথে দশটি ব্যাগ। আগেই বলা হয়েছে যে খ আর গ অনেকটা ফটোবাতিক। তারা সাথে নিয়ে নিয়েছে বিশাল বিশাল মারণাস্ত্র সেই উদ্দেশ্যে। এরকম যন্ত্রপাতি চ আগে দেখলেও এরকম আড়ম্বর আয়োজন দেখেনি। চ এর সমুদ্র ভ্রমণ প্রথমবার। তাই বদন যতই বদখত হোক না কেনো তাতে সান্ত্বনার দস্তখত দিয়ে খ বলে, এইবার তুমি আমার মডেল। যা করতে কমু, চুপচাপ তাই করবা। নড়তে পারবা না বা কিছু কইতেও পারবা না। প্রথমে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ে চ। মডেল বলে আবার সুপার মডেলের সাজে পোজ দিতে হবে নাকি? এত ছোট কাপড় তো সে সাথে আনে নাই। তাছাড়া মান-ইজ্জতের প্রশ্ন। প্রথম সফরেই সবার সামনে গতর খুলে ফটোসেশন যদি হয় তবে এরপরে কী হবে? বাসে ওঠার আগে সবাই বিড়ি ফুঁকে নিলো দুই প্রস্থ, ঙ আর চ ছাড়া। প্রথমজন বেশি বকবক করতে থাকায় সময়ই পেলো না (তাছাড়া পরিবেশটা পুরুষতান্ত্রিক ছিলো কিনা), আর দ্বিতীয়জন বিড়ির ধোঁয়ায় আগে থেকেই চোখে অন্ধকার দেখে, তাই রিস্ক নিলো না। সমুদ্র দেখার আগেই চোখকানা করার কোনো ইচ্ছা নাই তার।
বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পরে জানা গেলো বাসের ড্রাইভার পূর্ব কোনো এক অবৈধ সম্পর্কের জের ধরে ক এর দূরসম্পর্কের মামা হয়! ক নিজেই বললো এটা। ব্যাপারটা স্বাভাবিক। উচ্চ মননশীল ব্যাক্তিদের পরিবারে এমন ঐতিহ্য থাকে নাকি, খ আর গ সায় দিলো। ক এর ততক্ষণে প্রেমের জোয়ার এসে গেছে, ফোনে, কানে, মনে এবং হয়তো আরও কিছু কোণে। তাই অন্যদের কথায় নাক-দাড়ি কিছু না গলিয়ে সিটের উপর হাঁটু গেঁড়ে কম্বল পেঁচিয়ে তার তলে ডুব দিলো। ঙ মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলো ক এর এই ন্যাকামি দেখে। জলজ্যান্ত তাগড়া ঘ পাশে থাকাতেও তাদের রোমান্স এর অবস্থা ক এর ভার্চুয়াল রোমান্সের কাছে ফ্যাকাসে লাগছিলো বলে। মনে মনে ক-কে গালিও দিয়ে ফেলেছে এর মধ্যে হয়তো, খাড়া, আগে হোটেলে যাইয়া লই, আমরাও দেখায় দিমুনে। শেষমেষ সহ্য না করতে পেরে ঘ-কে নিয়ে চলে গেলো একেবারে বাসের পিছনের সিটে। সেখানে খ আর গ বসে ছিলো তখন। খ চিন্তা করছে বাসে কোনো হাগাহাগির সু-ব্যবস্থা আছে নাকি, ভুড়িতে টান দিলে তো বিপদ হয়ে যাবে। আর গ তখন মোচে হাত বুলাচ্ছে। ঘ+ঙ মানে ঘঙ দের চোখেমুখে রগরগে অবস্থা দেখে ভয়ে সাথে সাথে সামনে চলে এলো তারা পেছন থেকে। চ তখন আবালের মতো সামনের কাচ দিয়ে তাকিয়ে আকাশের তারা গুনছে। এই ডাগর-ডাগর বাড়ন্ত শরীর লইয়া পোলাডা এহনও বালেগ হইলো না, দীর্ঘশ্বাস ফেললো খ তাকে দেখে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার, পুরো পথেই ক এর মামা যে খেল দেখালো তা আর বলার নয়। পুরো বারো ঘন্টা লেগেছে পৌঁছাতে তার কল্যাণে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম পার হওয়ার পরে সে বাসে একেবারে ম্যারাথন স্পিড তুলে দিলো। চ মাঝে হয়তো একবার সকালে ঘুমের ঘোরে দেখলো ব্যাটারী চালিত অটোরিক্সা বাসকে ওভারটেক করে এগিয়ে যাচ্ছে। ঐ সময় ড্রাইভার নিজেও টলে পড়তেছিলো ঘুমে। ঘুম এড়ানোর জন্যে আবার একটু পরপর পপকর্ন আর চিপ্স খাচ্ছিলো। আর রাস্তার পাশে কাউকে দেখলেই গতি আরও কমিয়ে গলা উঁচিয়ে কুশলাদি বিনিময় করতেছিলো। খ দেখে একবার ক-কে জিজ্ঞাসা করলো, কিরে, তোর মামা কি ইলেকশনে দাঁড়াইছে?
কক্সবাজারে যখন পৌঁছালো বাস ততক্ষণে সূর্যের বয়স বুড়িয়ে দুপুর বারোটা বেজে গেছে। চ শুনলো ক-এর কাছে যে কক্সবাজারে হোটেলগুলোর চেক আউট টাইম নাকি দুপুর বারোটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তারমানে জাস্ট ইন ইন টাইম। রাস্তার পাশে একটা হোটেলের সামনে সঙ্গে আনা সব আলুথালু থলে পাহারা দিতে থলথলে ভুড়ি, ত্যালত্যালে সুরত, ঢলঢলে চোখে আর ম্যাজম্যাজে মেজাজে রয়ে গেলো যথাক্রমে খ, চ, ঙ আর ঘ। সেই গনগনে দুপুরের রোদে বিড়ি পুড়িয়ে-
কী আছে জীবনে আর,
নীলাকাশের মেঘপানে সুতাকাটা ঘুড়ি;
নীড় খুজে ধোঁয়া নিয়ে,
এইমুখের মোচ আর তোর খ্যাতদাড়ি-
ভাব নিয়ে গ বের হলো ক-কে নিয়ে হোটেল রুম ঠিক করতে। এদিকে ঙ এর মনে হলো যে টুথব্রাশ আনে নাই। টুথব্রাশ নগন্য, এত বড়ো ট্রাভেলব্যাগ যে এনেছে, তাতে ভুল করে এই নগন্য জিনিস ফেলে আসা অস্বাভাবিক নয়। একটু পরে তা নিয়ে ঘ এর সাথে ঘ্যানর ঘ্যানর শুরু করলো। ঘ তাকে পাঠিয়ে দিলো সামনের একটা খুপরি দোকানে। আবার সেও পিছু পিছু গেলো। কিছুক্ষণ পরে চ অবাক হয়ে দেখলো, ঙ আচার কিনে এনেছে এবং সেটা খেতে শুরু করেছে। টুথব্রাশের সাথে আচারের সম্পর্ক কী, এটা জিজ্ঞেস করতে যাবে এমন সময় দেখলো দুইটা ক্যামেরার স্ট্যান্ড কাঁধে ঝুলিয়ে ভুড়ি দুলিয়ে খ বাতাস খাওয়ার চেষ্টা করছে। যে, গরম পড়ছে...মুরগির আন্ডা নিয়ে রাখলে না, বরং মুরগি আন্ডা পাড়তে গেলেও পেছন দিয়ে ফ্রাই হয়ে বের হবে, একেবারে রেডিমেড। চ ঘেমে চুপসে গেছে আর ঙ আচার দিয়ে গরম চাটছে। ঘ তন্ময় হয়ে তার হবু পত্নীর নিবিষ্ট মনে আচার খাওয়া দেখছে। ঠাঠা গরমও তার চাহনি দেখে শরমে তাকে কিছু বলছে না। যা যাচ্ছে সব শরীর বেয়ে নেয়ে আসা ঘামের উপর দিয়ে যাচ্ছে।
প্রায় পনেরো-বিশ মিনিট পরে হোটেল পাওয়া গেলো। ক-তার প্রেমজ শত ব্যস্ততার মাঝেও দাড়ির ফাঁক গলে ফোন করেছে খ-কে। হোটেলের নাম ‘সী নাইট’। একটু ভিতরের দিকে। ছয়জনের লাগেজ চারজনে হাতে-পায়ে-কাঁধে-ঘাড়ে যে যেভাবে পারে নিয়ে হাঁটা দিলো সেইদিকে। তিনতলায়, দুইরুম ঠিক হয়েছে। চ জীবনে এই প্রথম দৃষ্টিতে লিঙ্গবৈষম্য দেখলো। তারা পাঁচ দামড়ার জন্যে একরুম, আর ঙ এর জন্যে একরুম! তাও আবার পাঁচজনের রুমের বাথরুমের ফ্লাশ কাজ করেনা। এটা জানার পরেই প্রায় সবার চোখ আগে আটকে গেলো আগে খ-এর ভুড়ির দিকে। গত বারোঘন্টায় যা ডিপোজিট হয়েছে সেখানে, তা যদি একবারে বের হয়, তাইলে নিশ্চিত, বাকি চারজনকে অন্যরুমে ডিসপোজ করতে হবে। খ মহানন্দে হারেরে করে ছুটে গেলো সবার আগে। ঘ-কে বাকি তিনজন জানালো, তুই তোর বউ এর সাথে থাক, ওই রুমে ডাবল বেড আছে। ঘ ঢোক গিলে বলে আমার ডর করে, পাগল পাইছস? শুনে ঙ উদাস হয়ে গেলো। বললো, আমি একা ঐরুমে থাকবো না। আমি তোমাদের রুমেই থাকবো। সাথে সাথে ঘ মাথা ঘামিয়ে বলে, মাথা খারাপ! তুমি যাও, ভাগো এইহান থাইকা।
সবাই ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পরে চ এর চতুর্দিকে চেয়ে ধরে। দোস্ত, তুমার তো পরথম সমুদ্র দেখা, এইডা আমাগো তুইলা রাখতে হইবো, এইডা সবার জীবনেই এক অন্যরকম সেরা অনুভূতি। চ কী বলবে ভেবে পায়না। এর আগে সমুদ্র সে টিভিতে দেখেছে, ভালো লেগেছে কিন্তু আসলে কী তেমন স্পেশাল? পানিই তো, না হয় লবণ ভরা। তাই বলে এত মাতামাতির আসলে কী আছে? দেখতে হবে ভালো করে। খ আগে থেকেই টার্গেট করে নেয় তাকে। বলে, তোমারে আমি টার্গেট করলাম। তুমি যখন দেখবা তখন ফটো তুলবো আমি। সমুদ্র না, ফটোসেশনের উত্তেজনাতেই সামান্য রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে চ, তাও আবার এই অসাধারণ ফটোগ্রাফার এর হাতে। এইবার মনে হয় সুপার মডেল হয়েই গেলো সে।
জাগতিক সব আবহের বাইরে তখনও ক-মোবাইল হাতে ধরে সমানে টিপে চলেছে। কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই। একটা টি-শার্ট, শর্টস্ আর মুখভর্তি দাড়ি নিয়ে তাকে পুরা হাফ-পেন্টু মেগামাইন্ডের মতো লাগছে। চ-অন্যদের সাথে আলাপে হালকা বুঝলো ক-এর প্রেমকাহিনী। সেটা আরেক ইতিহাস। তো ক সেসময় মাঝে মাঝে প্রলাপ বকছে, আমার বউ, পরাণের মৌ, পরাণের মালা, ঐ বিড়ি জ্বালা। তা দেখে একসময় ঙ প্রায় উত্তেজিত হয়ে বলেই ফেললো প্রায়, চলো-তো ঘ, আমাদের ঘর হতে এট্টু ঘুইরা আসি। তড়িঘড়ি মোচে পোচ দিয়ে গ বললো, এখন বেশি টাইম নাই, চলো আমরা খাইয়া ঘুইরা আসি আগে। এদিকে ততক্ষণে ব্যাগ হতে একটা পানির বোতল বের করলো। স্পেশাল পানি। কয়েকজনে হালকা টেস্ট নিয়ে রওনা হলো দুপুরের খাওয়ার জন্যে ঝাউবন হোটেলে, সেখান থেকে ডাইরেক্ট কলাতলী যাবে। খেতে যেয়ে হাত-মুখের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় অতিরিক্ত ভোজনে এক একজন অতিকায় পেটোয়াল হয়ে গেলো। নড়বে কীভাবে সে চিন্তায় অস্থির। আসার সময় ব্যাটারীতে চল্লিশ টাকায় আসলেও যাওয়ার সময় তাদের সাইজ দেখে কোনো ড্রাইভারই কমপক্ষে পঞ্চাশের নিচে রাজি হলোনা। তবুও মুলোমুলি আর ঝুলোঝুলি করে রওনা হলো ছয়জনে তাতে।
এরপরই সেই অব্যক্ত অবিস্মরণীয় মুহূর্ত চ-এর জন্যে। ব্যাটারী থেকে নেমেই সে দেখলো। চিরাচরিত নিয়মে নিরন্তর কালধরে ফিরে ফিরে ভেঙ্গে আসা সাদা ঢেউগুলো, পেছনে সবুজাভ নীল একটা আবছা রঙ এর আবহে। উপরে সাদাকালো মেঘগুলো তার মতোই থমকে থেকে দেখছে সেই নীলাধার। কীজানি কি হয় এই ভয়ে গ হাত দিয়ে ধরে রাখলো চ-কে, আর খ ক্যামেরা গলায় নিয়ে প্রস্তুত। চ-কী করে ছবিবন্দী করবে সে। ঘঙ তখন একে অন্যের হাত ধরে ঢ্যাংঢ্যাং করে হাঁটছে। ক নির্বিকার যথারীতি মোবাইল হাতে। কিন্তু চ একটা ভোদাই, কিছুই না করে খ আর গ কে হতাশ করে শুধু আস্তে আস্তে সামনে এগুতে থাকে। মুখে কোনো কথা নেই, কোনো কিছু অনুভবের ছাপও নেই। শুধু সৈকতে ইতস্তত শত মানুষের দিকে হাটঁতে থাকে অসাধারণ সেই আবহের একটি সাধারণ কণা হিসেবে মিশে যেতে। বার্মিজ স্যান্ডেলের ক্রমাগত মাড়িয়ে যাওয়া চাপে, ধীরে ধীরে নরম বালিতে ডুবে যেতে থাকা সাগরের অবাঞ্ছিত কোনো মৃত ঝিনুকের ন্যায় সেও সকলের সামনে থেকে যায় অস্ফুট, অব্যক্ত।
(চলতে পারে)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন