বৃহস্পতিবার, ২ জুন, ২০১১

প্রচ্ছন্নপ্রকটতা

কোনো এক প্রচ্ছন্ন বিকেলে দুপুরের অলস ঘুম শেষে হঠাৎ আমি আবার জেগে উঠি চোখ রগড়ে। বাইরে উদাস বিকেলের বাতাস জানালা দিয়ে আমায় ডেকে চলে, আয়, তাড়াতাড়ি। আর কতো ঘুমাবি? টেবিলের কোণায় রাখা নীলরঙ্গা নাটাই-টা চোখে পড়ে। তার একটা লেজ ঘুরে ঘুরে দুলতে দুলতে টেবিলের উপর উঠে গেছে। নচ্ছাড় ঘুড়িটা এখনও চিত হয়ে পড়ে আছে। বিভোর সুখস্বপনে তার ছেঁড়া লেজটা টেবিলের ধার গড়িয়ে নিচে দুলছে। মাথার উপরে গরমে ঘেমে একশেষ দেয়াল ঘড়ির ফ্যাসফ্যাসে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। নিঝুমরাতে সেইটাই নিশাচর টিকটিকির মতো লাগে, টিকটিকটিক। বিদ্যুৎ নাই, ফ্যানটা জিরিয়ে নিচ্ছে। সারাজীবন ধরে যেখানে অন্যেরা সামনে এগিয়ে যায় কিংবা পেছনে হারিয়ে যায়, সেখানে এই একটা জিনিসই শুধু নিজ জায়গায় অনড় থেকে ঘুরে যাচ্ছে। তার কোনো লক্ষ্য হয়তো নেই, শুধু পুনরাবৃত্তিতে পরিভ্রমণ।


বাইরে যেতে ইচ্ছে করেনা। আবার হঠাৎ-ই ইচ্ছা জাগে, দেই ঘুড়ির এই মরা ঘুমটার বারোটা বাজিয়ে দিতে। একটু অবাক হই আচমকা। আরে, এইখানে ঘুড়ি এলো কোত্থেকে? আমি তো ঘুড়ি শেষ উড়িয়েছি সেই বারো বছর বয়সে। আবার তাকাই। নাহ্‌, ঐখানেই আছে। স্থির ঘুমে তার কাগজের চামড়াটা কেঁপে কেঁপে উঠছে জানালার বাতাসে। আমি বোঝার চেষ্টা করি, আসলে আমি কোথায়? আশেপাশে ঘুরে তাকাই। দেয়ালটা ঠিকই আছে, তবে রঙটা দেখিনা। একটা অদৃশ্য প্রাচীর সেখানে শুধু। দরজাটাও হাওয়া হয়ে গেছে। শুধু মাথার পাশের জানালাটা, ফ্যান আর ঘড়ি একেবারে সুস্পষ্ট।

যাকগে, কী হচ্ছে তা আর না ঘাটাই। কিন্তু এই ঘুড়ি নিয়ে বাইরে গিয়ে কী হবে? আমি তো আমার গ্রামের বাড়ি নেই, পড়ে আছি শবাধারী এই শহরে, যেখানে মজ্জার ভিতরে এখনো হয়তো কিছু স্পন্দন খালি খালি বেঁচে আছে। আমার সেই সময়টা আর নেই, সেই বন্ধুরাও আর নেই। আমি এ কোন জীবনে? আমার সেইসব বন্ধুরা আজ কোথায়? সেই লাটিম, ইটের খোলা, সোনালী রঙ এর মার্বেল, প্লাস্টিকের ফুটো বলটা, পরিত্যাক্ত সাইকেল চাকার রিম, ছাল ওঠা টিপু বল...কোথায় গেছে সব? এ যে খালি সেই রঙ্গীন ঘুড়িটা আছে! বাকিরা কোথায়?

সবাই কি বদলে গেছে আমার এখনকার সাথীদের মতো? একটু, কিংবা পুরোটাই, কিংবা একটুও না। আমি জানিনা। জানতে ইচ্ছে করেনা। ইদানিং কীজানি হচ্ছে। আমার শুধু দেখতে ইচ্ছে করে, কিছু বলতে ইচ্ছে করেনা, লিখতে ইচ্ছে করেনা। আমি দেখি কীভাবে একই সূর্যের আলো সময়ের চাহিদায় নিজেকে বারবার ভাঙ্গে আর গড়ে, কখনো প্রভাত, দুপুর কিংবা গোধূলির রঙ এ। যখন আর পারেনা তখন বেলাশেষে ক্লান্ত হয়ে রাতের কোলে ঢলে পড়ে। রাত সবচেয়ে হয়তো বৈচিত্র্যময়, কিন্তু আপন বৈচিত্রে সে চাপাস্বভাবের, কাউকে জানায়না। তাকে আবিষ্কার করতে গেলে তার সেই বৈচিত্র্যগুলো নিজে ধরতে হবে। মাঝে মাঝে এখন রাত আমার সাথে আড্ডা দেয়, নির্ঘুম আঁধারে। আমি সেই  বৈচিত্র্য ধরেছি কিনা জানিনা, কৌতূহলও নেই। কিন্তু রাত আমায় ছাড়েনা, দিন থেকে কিংবা জোছনা থেকে।

কী আবোল তাবল লিখি মাঝে মাঝে দিশা থাকেনা। হয়তো আমিও আমার বন্ধুদের কাছে আমি যেমন দেখি সেরকম একজন। ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, বদলে যাওয়া। কিংবা হয়তো আমার সাধের ঘুড়ির মতো হারিয়ে যাওয়া সাথীর অবয়ব। আগে বন্ধুদের আবিষ্কার করতে চাইতাম, তাদের প্রত্যেকে কে কেমন, আমার অবস্থান তাদের ভীড়ে কোথায়? এখন আর তা নেই, এখন দেখতে ইচ্ছে করে, দেখা হলেই কৌতূহল মিটে যায় কেনোজানি। পাঁয়তারা খুজি চলে যাওয়ার, আগ্রহ নেই। আবার অজুহাতও নেই। প্রত্যেকের প্রোফাইলে এসে আবার ঢু মারি। একেকজনকে নিয়ে কল্পনা করি...বড়োই আজব।

সেই একই ছেলে, যে কখনো সারারাত ঘুমাতো না, মুভি, গেম, আড্ডা কিংবা গানের আসরের মায়ায়; আজ সে ঘুমের দরজায় সবার আগে দাঁড়িয়ে থাকে। যে কিনা ক্লাসে স্যারের কাছে ধরা খেলে গালি দেয় মনে মনে, শালার পড়ানোর কথা, পড়া। আমি ঘুমাই না হাওয়া খাই পিছনে বসে তাতে তোর চুলকায় ক্যান; সেই ছেলে আজ তার ছাত্রদের চিন্তায় নির্ঘুম রাত জেগে অস্থির হয়ে ওঠে। যেখানে আড্ডার বিষয়বস্তু মূলত খেলা কিংবা প্রেম, সেখানে আজ হানা দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে অফিসের কলিগ আর বস্‌ এর হাইলেভেলের কর্মকান্ড। যে কখনো জীবনে টি-শার্ট ছাড়া অন্য কিছু পরে নাই...সে আজ কর্পোরেট অফিসে স্যুট-টাই-বেল্টের মধ্যে সুন্দর খাঁচায় নিজেকে তুলে ধরে রাখে দিনের এক তৃতীয়াংশ সময়।

যে কিনা আগে বিকেল কিংবা মাঝরাত পার হলেই ঘুরার জন্যে হন্যে হয়ে উঠতো বন্ধুদের সাথে, সেই আজ বিকেলটাকে একলা ফেলে বসে থাকে নিরন্তর কর্মতৎপরতায়। বৃষ্টি হলেই ভেজার জন্যে ছটফট করতে থাকা সে পাগল ছেলেটা আজ বৃষ্টি দেখে নীরবে চায়ে চুমুক দেয় জানালার এপাশ থেকে। একদা কবিতাপাগল সেই বদ্ধউন্মাদ আজ তৈরি করে লাভ-লোকসানের নীরস হিসাব সারাদিন ধরে, হাঁফ ছাড়ে মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে বেনসনের ধোঁয়ায়। মনের আনন্দে ধানক্ষেতের আইল দিয়ে একহাতে বড়শি, অন্যহাতে ধানের শীষ ছুঁয়ে চলা ছেলেটা আজ ল্যাবে বসে বসে তৈরি করে তার বিদেশী প্রফেসরের জ্ঞানের ঝুলি, কোনো এক স্বাধীন স্বপনের ঘোরে।

নাহ্‌, আর ভাবতে পারিনা। বড়ো অস্থির লাগে। ধুকপুক করতে থাকে বুক। ঘেমে আরও ঘেমে উঠি। যাকগে, যখন ঘুড়িটা দেখেছি, নাহয় আজকের মতো নিয়ে ওটাকে ছাদে যাই। আজ নাহয় আমি আর বদলে না যাই সেসব দিনের থেকে। দেখি, আমায় দেখে কেউ আসে কিনা আমার সাথে। চোখভরা আশা নিয়ে আবার তাকাই টেবিলের দিকে। নামতে যাবো। কিন্তু একি? ঘুড়িটা নেই! পড়িমরি করে ছুটে যাই। আসলেই নেই। কী অবিশ্বাস্য! ঘরে এর মধ্যে কেউ আসেনি। ঘুড়ি তো নেই, নাটাই ও নেই। আমি তবু হাল ছাড়িনা। হয়তো আমার জন্যে সে ছাদে অপেক্ষা করছে। আমার এখন ছাদে যেতে হবে। যে ছাদটার উপরে আছে শুধু অসীম নীলাকাশ আর একরাশ মুক্তির সুবাতাস।

( হঠাৎ এই মাঝরাতে কেনোজানি আমার সব বন্ধুদের খুব মনে পড়ছে। তাই এইসব আবোলতাবোল হিজিবিজি লিখলাম, কী যে হইলো আল্লাহমালুম। যাইহোক, বন্ধুরা, তোমরা যেখানেই থাকো...খুব খুব ভালো থাকো...আমাদের সেই প্রাণবন্ত সময়ের মতো...বদলে যেওনা, বরং বদলে দাও সকল বন্দীত্ব আর মরে যাওয়া...তোমাদের খুব মিস করি...সবাইকে...সবসময়)

কোন মন্তব্য নেই: