সোমবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১১

নিশিঝরা বারিঘোর

বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। শান্ত, নির্বিকার আর কেমনজানি বিষণ্ন। সমস্ত রাত্রি ধীরে ধীরে জেগে উঠছে নিঃশব্দে প্রায় তার সাথে। আঁধারগুলো আশেপাশের অলিগলির আনাচে কানাচে হতে ভিজতে ভিজতে বের হয়ে আসছে হিমেল আমেজে। শুধু মাঝেমাঝে দুই একটা বালিবাহী বা আবর্জনাবাহী ট্রাক পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হেডলাইটের চোখঝলসানো আলোর ভয়ে পুনরায় ক্ষণিকের জন্যে লুকিয়ে যাচ্ছে। ব্যালকনির ওইপাশে একটি আমগাছের ডালপালা ভেদকরে মাথা ঈষৎ বের করে আছে একটি সোডিয়াম বাতি, পথিকের অভাবে একলা যেতে যেতে রাতের আঁধারে যেনো পথটা আপন গতিপথ না হারিয়ে ফেলে। বৃষ্টিস্নাত আমের পাতা সেই আলোতে পানির সাথে মিশে চকচক করছে আর পরম আয়েশে হালকা বাতাসের ঝাপটায় হেলেদুলে বাতির সাথে রাজ্যের আলাপ জুড়েছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বাতির চারপাশে হলদে রঙ এ সেজে নেচেনেচে সে গল্প শুনছে। দূর থেকে দেখলে কিন্তু অন্যরকম মনে হয়। যেনো আগুনের চারপাশে ইতস্তত কিছু স্বচ্ছ জলরঙা পোকারা ওড়াউড়ি করছে। ব্যালকনির গরাদে আটকে শুধু দৃষ্টি দিয়ে আড়ি পেতে তাদের সেই কথা শোনার কিছুক্ষণ চেষ্টা করলাম। কিছু বুঝি না। শুধু একটু পর পর হালকা বৃষ্টির ঝাপটায় ব্যালকনি কেঁপে কেঁপে ওঠে অব্যক্ত কিছু শিহরণে। তার সাথে তাল হারিয়ে আমিও কাঁপি।


সেই কাঁপুনিতে একটুপরে আচমকা নিজের অজান্তেই স্মৃতির পলেস্তারা কিছু খসে পড়ে যায়। উন্মোচিত হয়ে ভিজতে থাকে ভেতরের জমাটবাঁধা দেয়ালের মজ্জাগুলো। তড়িঘড়ি খসে পড়া অংশ কুড়োতে নিচে খুজি। কিন্তু ততক্ষণে তা ধুয়ে রাস্তার পানির প্রবাহে মিশে গেছে। কিছু করার না পেয়ে অগত্যা সেই বিক্ষত দেয়ালে তাকাই। আমার সাথে সাথে ঘাড় ঘুরিয়ে যেনো সেই সোডিয়াম বাতিটাও তাকায়। হঠাৎ প্রতিসরণে বৃষ্টির গতিপথও একটু হেলে যায় যেনো। নদীর চরে কাশবন ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি হাঁটতে থাকি সেখানে, বৃষ্টির মধ্যে। আরেকটা আমি আমার শৈশবের বাহক বাইসাইকেল নিয়ে কাঁদার মধ্যে পানি ছিটিয়ে ছুটতে থাকি। পলক না পড়তেই পাশের আমাকে জানলার গ্রিল ধরে বসে থাকতে দেখি, একটা কচুপাতা বাইরে ভিজে ভিজে কীভাবে একটা বৃষ্টির মুক্তো তৈরি করে সেইটা পর্যবেক্ষণে। আর তারপর সেই অলংকার গড়িয়ে গড়িয়ে মাটিতে ঠেলে দেয়। একটুপরেই আবার জানলাটা  প্রসারিত হতে থাকে কেমনজানি। আমার শীত লাগতে থাকে। ভালো করে চেয়ে দেখি, আমি আসলে অনেক উপরে, এগারোতলায়। মেঘ নেমে গেছে মাটিতে, আমি মেঘের বিলাসী কল্পনায় উপরে উঠতে আছি, লৌকিকতা আর এসির মায়াজালে। চাইলে জানলার কাচটা সরিয়েই বৃষ্টি ছোঁয়া যায়। কিন্তু আমি দেখি সেই আমি তা না করে শুধু দীর্ঘশ্বাসে সন্তুষ্ট হয়ে চলেছি ক্রমশ।

এরপর আমি বিলের পানিতে বৃষ্টির ফোঁটা আর ঢেউতে রূপোলি ঝিকিমিকি দেখি, শহরের ফুটপাথে ফিরে আসি, স্কুল-কলেজের মাঠে ফুটবল নিয়ে আছাড় খাই, বাসে হুটকরে অসময়ে জানলা খুলে খামাখা পাশের যাত্রীর ধমক গলাধকরণ করি, অবারিত ধানক্ষেতে বাতাস আর বৃষ্টির হারিয়ে যাওয়া দেখি, পলিথিনে মোড়ানো উদ্বাস্তুর চেহারায় ব্যালকনির বিলাসীতা দেখি, শহুরে বৃক্ষে কাকভেজা কাকের ডানার ভেজা ঝাপটার পরশ নিই, রাস্তার সাথে ভিজতে ভিজতে উদ্দেশ্যহীন হাঁটা ধরি, কাঁথামুড়ি দিয়ে কখনও সান্ধ্য ঘুমে নিবিড় প্রশান্তি লালন করি ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং সেই সকল আমার সাথে আমি দেখতে থাকি বর্ষায় ভিজে যাওয়া, ভেসে যাওয়া আর ডুবে যাওয়া সকল প্রান্তর, নদী, মাঠ, গাছগাছালি, গ্রাম, শহর, আকাশ, মাটি, অস্তিত্ব, সময়, অনুভূতি, কল্পনা, দিনরাত্রি, হতাশা, সার্থকতা, সত্য, মিথ্যা, নৈঃশব্দ, থাকা-না-থাকা, বেঁচে থাকা কিংবা বেঁচেবেঁচে মরে থাকা, মানুষ এবং মানুষের সংজ্ঞা; সব মিলেমিশে একাকার, নিয়ত ধূসর বর্ণে।

আর এভাবেই এক নগন্য বৃষ্টি-রাত্রির আঁধার ক্রমশ নিগূঢ় হয়ে ওঠে ধুয়ে যাওয়া পলেস্তারার উপকরণে। এবং তা হারানোর একটা ভোঁতা অনুভূতিতে ঘোলা হতে থাকে সোডিয়াম বাতির হলদে আলো। আঁধারগুলা একটূ দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যায়, আমাকে দেখে লুকাবে কিনা। অথচ আমি প্রায় অসাড় হয়ে ব্যালকনির গ্রিল ধরে থাকি। ঘোলাচোখে স্পর্শ করতে থাকি রাত্রি, আঁধার, আকাশ, ঝাপসা মেঘ, সোডিয়ামবাতি, রাস্তা, অতন্দ্র নীরবতা আর এইসব অনুভূতির ভিজে ভিজে ডুবে যাওয়া বা ভেসে যাওয়া।

(২০/০৭/১১, রাত ৩টা)
                           হেলুসিনেশনে হ্যালোজেন রাত্রি বারির বর্ষণে

কোন মন্তব্য নেই: