মঙ্গলবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১১

স্মৃতিপাঠে বিদ্যাপীঠঃ আদ্যপান্তে আদর আলী

-আদর আলী-ই-ই-ই।
-ইয়েস স্যার।
-এদিকে আসো। দেখি তুমার জামাকাপড় ঠিক আছে কিনা। ইউনিফর্ম পইরা আইছো তো?
-জ্বি স্যার।
-জুতায় ময়লা ক্যান? হালচাষ করছো নাকি ক্লাসে আসনের আগে? প্যারেডে যাওয়া বাদ দিয়া?
-না, স্যার। প্যারেডে লেফট-রাইট করার সময় ধূলো উড়ে ময়লা হয়ে গেছে বোধহয়।
_ও, আচ্ছা। কিন্তু প্যারেডে পা না নাড়াইয়া লাত্থি দেওনের লাহান ঝাকাইলে তো ধূলা উড়বোই। অন্য কারও পায়ে তো তুমার লাহান ময়লা দেহি না। তা শরীল কীরম আছে? রাইতে ভালা ঘুম হইছে?
-জ্বি স্যার, হয়েছে।
-আর লেহাপড়া? নাকি জুতমতো ঘুমাইতে গিয়া ভুইলা গেছো?
-না, স্যার। পড়াশুনাও করেছি।
-হুম, তা দেহি কী পড়লা। যাও বই নিয়া আইসা শুরু করো কাইল যেইহানে শ্যাষ হইছিলো ঐহান থাইকা।
 
এইভাবেই শুরু হতো আমাদের ক্লাসে সুজিত স্যারের কার্যক্রম। আমি তখন ক্লাস থ্রিতে সবেমাত্র নতুন স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ক্লাসটীচার রুনি ম্যাডাম। আর সোহাগ ওরফে আদর আলী ছিলো সুজিত স্যারের নিয়মিত শিকার। ব্যাপারটা খোলাসা করে বলি।

ছেলেটার নাম ছিলো সোহাগ। ও আর আমি একই ক্লাসে, মানে ক্লাস থ্রিতে। আমি গ্রামের স্কুল ছেড়ে মফস্বলের এই স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হলাম। ক্লাসমেট সবাই নতুন এবং অপরিচিত। গ্রামের স্কুলের কেউ নেই। তো সবার সাথে পরিচয় তখনও হয়ে ওঠে নি। অল্পবিস্তর যে কয়েকজন হয়েছে তারা হলো মঞ্জু, রাজু, সোহাগ, আলীম, রনি, পলাশ, নকীব, রিপন, মিষ্টি, হালিমা, রীনা, রুনা, ফাতেমা ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে রাজু, সোহাগ আর পলাশ জানি কীভাবে কীভাবে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হয় আব্বু প্রথমদিন জানিয়ে দিয়েছিলেন। আমার অত মনে নেই। শুধু জানতাম এরা আমার বন্ধু, উপরি হিসেবে আত্মীয়। আবার শুধু ক্লাসমেটই না, ভর্তির সময় জানলাম আমাদের ক্লাসটীচার রুনি ম্যাডামও নাকি আমার ফুপু হন! চারিদিকে পরিবার! এদিকে আমি পড়লাম বিপদে। অন্যেরা বিশেষত আহলাদী ছেলেমেয়েরা ক্লাসের সময় রঙয়ে ঢংয়ে সুর তুলে আদর করে ম্যাডামকে রুনি আপা, রুনি আপা করে ডাকাডাকি শুরু করলো। কিন্তু আমি ফুপুকে কীভাবে আপা ডাকা যায় ভেবে পেলাম না। বারবার ম্যাডাম ডাকতে গেলেও আবার কানের কাছে মনে হতো দ্রিমদ্রাম আওয়াজ বের হচ্ছে। তবুও চালিয়ে গেলাম ম্যাডাম হিসেবেই। অবশ্য তখন পর্যন্ত ম্যাম নামক ডাকাডাকির সাথে আমাদের পরিচয় হয়নি।

এই স্কুলে আমার ভর্তির ব্যাপারটা কিঞ্চিত অস্বাভাবিক। আমাদের থানাসদরে এইটাই সবচেয়ে বিখ্যাত স্কুল হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া আমার আব্বুও এই স্কুলে পড়েছেন, আবার কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। আর দাদাও এই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। বংশপরিক্রমায় আমার নসীবেও এসে জুটলো এইটা। যাকে বলে পারিবারিক ঐতিহ্য। স্কুলের নাম সংক্ষেপে পাইলট স্কুল। এইখানে ক্লাস থ্রি, সিক্স আর নাইনে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করে ছাত্র-ছাত্রী নেওয়া হয়। আশেপাশে আর তেমন পরিচিত ভালো স্কুল না থাকায় এইখানে ভর্তির প্রতিযোগিতা ছিলো সবচেয়ে বেশি। তবে আমার ভাগ্য ভালো, আমাকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়নি। আব্বু অফিসে যেতেন স্কুলের পাশ দিয়েই। আর আমাকে মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে যেতেন মাঝে মাঝে অফিসে। তো আমাকে ভর্তি করবেন কিনা এ বিষয়ে পরামর্শের জন্যে একদিন নিয়ে গেলেন স্কুলের প্রধানশিক্ষকের কাছে। তাঁর নাম জালাল স্যার। ততদিনে ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেছে কি হয়নি তা আমার মনে নেই। জালাল স্যার শুধু প্রধানশিক্ষকই নন, তিনি আব্বুরও শিক্ষক ছিলেন। আর স্কুলের কেরানি পর্যন্ত কীভাবে জানি আব্বুকে চিনতো। আর এইটা ছিলো আমার জন্যে বড়ো মুসিবত। যদিও ভর্তির সময় ভেবেছিলাম, যাক ভালোই হলো। সবাই আব্বুকে চেনে, আমার কোনো অসুবিধা হবে না। অসুবিধা হয়নি বটে, কিন্তু পদে পদে নজরে থাকার বিড়ম্বনাও কম পোহাতে হয়নি।

তো যাইহোক, আব্বু জালাল স্যারের রুমে আমাকে নিয়ে ঢুকলেন। আমি পিছুপিছু ঢুকলাম। স্যার প্রথমে আমাকে দেখতেই পাননি। টেবিলের সামনে যে চেয়ার ছিলো তার একটিতে আব্বু বসলেন। আর একটিতে আমাকে কোলে করে বসিয়ে দিলেন। কেনোনা ঐ চেয়ার ছিলো আমার নিজে থেকে ওঠার আয়ত্তের বাইরে। সালাম দিলাম। এরপরে আব্বুর সাথে স্যারের আলাপ শুরু হলো। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে আর ঘাড় বাঁকিয়ে সমানে রুমের ভিতরে আশেপাশে কী আছে দেখে চলেছি। সবচেয়ে চমকপ্রদ যে জিনিসটা দেখলাম তা হলো টেবিলের উপরে রাখা একটা পেপারওয়েট। এত সুন্দর পেপারওয়েট আমি এর আগে দেখিনি। ঐটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলাম। এবং এই পেপারওয়েটটার কথাই কিছু মনে আছে। আর কী কী দেখেছিলাম স্পষ্ট মনে নেই। মনে হয় একটা আলমারি, কিছু বড়ো বড়ো কাগজের বান্ডিল, একটা ঘন্টাসমেত দেয়ালঘড়ি, একটা ক্যালেন্ডার আর কিছু জিনিসপত্র দেখেছিলাম সেই ঘরে।

হঠাৎ স্যারের ‘এই ছেলে ভর্তি হবে ক্লাস থ্রিতে?’ প্রশ্নে থতমত খেয়ে তাকালাম স্যারের দিকে। তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাইলেন না। আমি অনেক হ্যাংলা পাতলা ছিলাম ঐসময়, বয়সও অনুপাতে একবছর কম ছিলো। সুরত দেখে স্যারের নাকি মনে হয়েছিলো আমি ক্লাস ওয়ানের বা কেজিশ্রেণির পিচ্চি। আব্বুর কথা শুনে তিনি অনেকটাই হতভম্ব হয়েছেন, আর এদিকে আমি তখন প্রায় আক্কেলগুড়ুম, বলে কী এসব! স্যার যাচাই করার জন্যে আমাকে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। আমিও ঝটপট উত্তর দিতে থাকলাম। কী কী প্রশ্ন করেছিলেন ঐদিন, আমার তা মনে নেই আজ আর। তবে এটুকু স্মরণে আছে যে তিনি কিছু জিনিসের নাম, কিছু শব্দার্থ, কিছু অঙ্ক প্রভৃতি জিজ্ঞাসা করেছিলেন। প্রশ্নত্তোর পর্ব শেষে আমাকে বাইরে যেতে বলে আব্বু আলাপ শুরু করলেন আবার স্যারের সাথে। কী হলো বা হয়ে গেলো আমি বুঝিনি তখন কিন্তু কয়েকদিন পরে যখন আমাকে নিয়ে আব্বু আবার এলেন স্কুলে রেজিস্ট্রি খাতায় নাম লেখাতে তখন বুঝে গেলাম, আমি এবার ক্লাস থ্রিতে, রুখবে আমায় কে?

তবে এই স্কুলে ঢুকলেই ঐসময় কেনোজানি আমার বুক দুরুদুরু করতো। নিম্নমাধ্যমিক শ্রেণীদের জন্যে প্রকাণ্ড একটা দোতলা ইংরেজি ‘L’ আকৃতির দালান, দৈর্ঘ্যে মনে হয় প্রায় পাঁচশ ফুটেরও বেশি। আর একটা দানবাকৃতির অডিটোরিয়াম (যেটার ভিতরে ঢুকলে আমার আস্ত ফুটবল মাঠ বলে মনে হতো পরে ) এবং প্রাথমিক শ্রেণীদের জন্যে একটা ইংরেজি ‘I’ আকৃতির দালান ছিলো। আর সামনে বিশাল একটা মাঠ। আমার মনে হতো, এই মাঠে একা ছেড়ে দিলে কিংবা মাঠের ঐপাশে একাএকা যেতে বললেই বুঝি আমি হারিয়ে যাবো। প্রথম কয়দিন তাই ভয়েভয়ে আব্বুর হাত ধরে যেতাম ক্লাসে, যদিও আব্বুকে আমার ভয়ের কারণ বলিনি। আব্বু আমাকে ক্লাসের সামনে রেখে তারপর চলে যেতেন অফিসে।

প্রথম কয়েকদিনে আমি পরিবেশের সাথে ধাতস্থ হতে চেষ্টা চালিয়ে গেলাম। গ্রামের স্কুলের সাথে এখানকার শুধু একটা জিনিসেরই মিল পেলাম, আর তা হলো ছুটির সংকেত দেবার জন্যে ব্যবহৃত ঘণ্টা। তাছাড়া আর কিছুতেই মিল নেই। বরং প্রথম প্রথম আমি লক্ষ্য করলাম এখানকার ছেলেমেয়েরা কেমনজানি শুরুতে একটা লাজুক লাজুক ভাব করছে। আর অজ্ঞাতকারণে ক্লাসের প্রায় সবারই কেবলমাত্র দুই ধরনের পোষাক। ছেলেদের সাদা শার্ট আর নেভিব্লু প্যান্ট, মেয়েদের নীলজামা, সাদা ওড়না আর সাদা পায়জামা। কেবলমাত্র আমার মতো হাতে গোনা কয়েকজন সাধারণ পোষাকে আছে। এদিকে আব্বু একদিন বাসায় বললো আমাকেও নাকি ওরকম ড্রেস কিনে দেবে কিছুদিনের মধ্যেই, ওর নাম স্কুলড্রেস। ঐটা না পরলে স্কুলে চরম শাস্তি, এমনকি বেরও করে দিতে পারে। আমি ভেবে পেলাম না স্কুলে যাওয়ার সাথে ঐ ড্রেসের কী সম্পর্ক। তবে নতুন পোষাক আসছে শুনে মনে অনেক আনন্দ হলো।

ক্লাসের প্রথমদিকে কয়েকজন আমার মতো যারা সাধারণ পোষাকে ছিলো তাদের সতর্কসংকেত জানিয়ে দিলো এমনভাবে ‘undress’ হয়ে আসলে স্যারের কাছে বেতের বাড়ি খেতে হবে। তখনও এই ‘undress’ মানে কী তার কিছুই জানিনা। শুধু শুনে যেটা ধারণা হলো, স্কুলড্রেস পরে না আসলেই ‘undress’; গায়ে যাই থাক তাতে কিছু যায় আসে না। এদিকে টেইলার্সে একটু দেরি হচ্ছিলো বিধায় আব্বু অনুরোধ করেছিলেন রুনি ফুপুর কাছে যেনো পোষাক না আসা পর্যন্ত আমাকে একটু যেনো ছাড় দেয়া হয়। আর আমি ছোটকালে খুব ভীতু ছিলাম (একমাত্র বন্ধুদের সাথে ছাড়া), এমনকি মানুষের জটলা দেখলেও আমি কুঁকড়ে যেতাম। তাই আব্বু বলে দিয়েছিলেন যেনো আমার ব্যাপারে কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি তাঁকে জানানো হয়, আমাকে কিছু না বলে। ভয় পেয়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটায় ফেলি কিনা এইনিয়ে আব্বু বেশি ভীত ছিলেন।

এরকম ঘটনা শুরুর দিকে বেশ কয়েকবার ঘটলো। যেমন, প্রথমেই ধরা যাক ক্লাসের ব্যাপারটা। গ্রামের স্কুলে আমাদের একজন স্যারই পুরো ক্লাস নিয়ে ছুটি দিয়ে দিতেন। তো আমারও তাই ধারণা ছিলো যে, একজন স্যার বা ম্যাডামই ক্লাস নিবেন। আর তাই রুনি ম্যাডাম প্রথম ক্লাস নেবার পরে আমি নিয়মমতো ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে সুড়সুড় করে বেরিয়ে যেতাম স্কুল গেটের বাইরে। দাঁড়িয়ে থাকতাম আব্বুর আসার অপেক্ষায়, আর রাস্তার হরেকরকম দৃশ্য উপভোগ করতাম। এভাবে শুরুর কয়েকদিন এগারোটা থেকে প্রায় দুইটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। এবং সেইসময় কিছু অস্বাভাবিকতা যে আমার নজরে এলো না তা না। বরং আমি লক্ষ্য করলাম, আমি বের হলেও স্কুল থেকে আর কেউ বের হয় না পৌনে দুইটার আগে (ঐ সময় প্রাথমিক স্কুলের ক্লাস শেষ হতো)। আর আগের স্কুলের মতো ঘণ্টা মাত্র একবার না বাজিয়ে নিয়মিত বিরতিতে কয়েকবার বাজায়। আমি এটা ধরতে না পারলেও জানার জন্যে উৎসুক ছিলাম। পরে আমার ভুল ভাঙ্গালেন শিরীন আপু। তিনি আমার কাজিন, আমার থেকে পাঁচ ক্লাস উপরে এবং একই স্কুলে পড়তেন। তিনি একদিন জরুরি কী এক কাজে বাইরে এসে দেখেন আমি হাওয়া খাচ্ছি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। আপু আমাকে ধমকে জানালেন, তুমি ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছো! দাঁড়াও, চাচাকে সব বলে দেবো। আমি প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে বৃত্তান্ত বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলাম। পরে তিনি পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে আমাকে ক্লাসে নিয়ে গেলেন আবার।

এরপর সুজিত স্যারের ব্যাপারটা। সুজিত স্যার আসতেন সেকেন্ড পিরিয়ডে। তো আমাকে প্রথম দেখলেন স্যার উপরের ঘটনার পরেরদিন। কেনোনা এর আগেতো আমিই থাকতাম না। শুরুতেই একটা অতিরিক্ত ‘undress ছেলে দেখে তাঁর মেজাজ গেলো বিগড়ে। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, নাম কী? বললাম। ড্রেস নাই কেন এরপরে জিজ্ঞাসা করলেন। আমি জানালাম ড্রেসের ব্যাপারটা। স্যার তখন কড়ামুখে বললেন যে ড্রেস আসলে তারপরে স্কুলে আসতে। আমার চোখে তখন প্রায় পানি চলে এসেছে। তখন রাজু না কেজানি আব্বুর কথা বললো স্যারকে এবং আরও ব্যাখা করে বোঝালো ড্রেস না থাকার কারণ। স্যার বুঝতে পেরে আমাকে আর কিছু বললেন না। শুধু বেঞ্চে গিয়ে বসার আদেশ দিলেন।

এই স্যারই আমার অন্যতম প্রিয় স্যার ছিলেন স্কুলে। তিনি কথা বলতেন নাকে নাকে। মানে একটু নাকিসুর বের হতো। আমার নামের দৈর্ঘ্য অনেক লম্বা, পাঁচ শব্দের। তিনি সেই নাম পুরো ধরে ডাকতেন সুর করে। আমাদের তিনি ইংরেজি পড়াতেন ক্লাস থ্রিতে। মাঝারি গড়নের শ্যামলা বর্ণের শান্ত সুবোধ মানুষ। নাকের নিচে আবার সরু গোঁফ আছে। তিনি ছেলেমেয়েদের সঙ্গে প্রায় সবসময়ই মজা করে কথা বলতেন। শাসনের সময় এলে অনেক গম্ভীর হয়ে যেতেন বটে তবে আমরা সবাই ভয় পেলেও স্যারকে কখনও খারাপ মনে হতো না। আর সোহাগের সাথে ছিলো তাঁর স্পেশাল খাতির। সোহাগের বাবার সাথে আগে থেকেই চেনাজানা ছিলো বলে সোহাগের সঙ্গে তিনি ভাব নিতেন বেশি। আর সোহাগ আমার চেয়েও ভোলাভালা ছিলো বলে প্যাদানি খেতো বেশি। স্যারের ক্লাসে এসেই প্রথম কথা ছিলো, আদর আলী-ই-ই-ই। এদিকে আসো। ওর নাম আদর আলী হলো কীভাবে তা কেউ জানে না। এমনকি এটা যে সোহাগ থেকেই এসেছে তাও আমরা অনেকদিন পর্যন্ত বুঝিনি, সোহাগও না। আমাদের ধারণা ছিলো স্যার তাকে অনেক আদর করেন বলেই আদর আলী বলে ডাকেন।

এই আদর আলীর কাজ ছিলো ক্যাপ্টেনকে ডেকে আনা স্যারের সামনে (যদিও স্যার চাইলে নিজে থেকেই ক্যাপ্টেনকে ডাকতে পারতেন), চক নিয়ে আসা, ব্ল্যাকবোর্ড মোছা, রিডিং পড়া, আগের দিনের পড়া বলা ইত্যাদি ইত্যাদি। স্যারের টেবিলে একটা কঞ্চির বেতও ছিলো ভয়ানক, কিন্তু সেটা স্যারকে কালেভদ্রে ব্যবহার করতে দেখেছি। বরং কেউ পড়া না পারলে তার পিঠে ঠাস করে হাতের তালু দিয়ে তাল ফাটাতেন জোরসে। এদিকে সোহাগ স্যারের দৃষ্টি এড়িয়ে বাঁচতে ব্রাউনিয় গতির মতো ইতস্তত সব বেঞ্চ চষে বেড়াতো দিনের পর দিন। কিন্তু স্যার তাকে ঠিকই বের করে আনতেন। সোহাগের বড়ো সমস্যা ছিলো, সে রিডিং পড়তে মনে হয় অস্বস্তি বোধ করতো। তার প্রায়ই কথা জড়িয়ে আসতো। এবং যখনই এমন হতো, স্যার তাকে আবার পড়তে বলতেন জোরে ঐ জায়গা। আর সাথে অ্যাঁ, উঁহ তো আছেই। আমাদের সবারই প্রায় এমন অনুসর্গরোগ ছিলো উচ্চারণে। পরে নিয়মিত অভ্যাসে স্যারের নির্দেশনায় ধীরে ধীরে তা কেটে যায়।

আমাদের ক্লাসের ঠিক পাশেই একটু পিছনের দিকে একটা রক্তজবার গাছ ছিলো বেশ বড়ো। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমরা জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখতাম তা। সেখানে অনেক ফুল ফুটতো, আর কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতেও পড়ে থাকতো। একেবারে টকটকে লাল এক একটা ফুল। আর মাঝে কুসুমবর্ণের কোমল রেণুর দন্ড। চারিপাশে হলদে আর লাল আভায় বর্ণিল হয়ে থাকতো গাছটা। এদিকে কোনো স্যার বা ম্যাডাম যখন ক্লাস শেষে বেরিয়ে যেতেন তখন আমরাও কয়েকজন বেরিয়ে যেতাম ঐ গাছের কাছে। গাছের ডাল ধরে ঝুলতাম। মাঝেমধ্যে দুই একটা ফুলও ছিঁড়তাম। পরে দূর থেকে স্যারের আসার আভাস পেলেই দৌড় দিতাম ক্লাসে। কিংবা অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে থাকতাম কোনো স্যার আচমকা হঠাৎ এসে পড়লো কিনা দেখতে। আজ আর সেই গাছটা নেই, নেই সে রক্তজবা ফুল, সেই রঙ্গীন দিনগুলোও। সেই জায়গাতে এখন কিছু নেই, পাশের ক্লাসরুম ছাড়া তারা সবাই হারিয়ে গেছে। আর তাদের সাথে হারিয়ে গেছে আমার কিংবা আমাদের সেই শৈশবের উৎসুক, কৌতূহলী, আগ্রহী, দুষ্টুমির, ভয়মেশানো চাহনি আর অপেক্ষাগুলোও।


(চলতে পারে)




কোন মন্তব্য নেই: