ব্যাপারটা ঠিক কী হচ্ছে বুঝতে বেশ সময় লাগলো। ঘরে আমার বিছানা মেঝেতা পাড়া পশ্চিমের দেয়াল ঘেঁষে। এবং সেখানে একটা জানলা আর একটা ব্যালকনি আছে। আমি বাংলার ‘দ’ হয়ে পড়ে আছি দেয়াল ঘেঁষে। বালিশ জাজিমের বাইরে পড়ে নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে। পাশে ল্যাপটপ চালু রাখা। সেখানে মিডিয়া প্লেয়ারের স্ক্রিনসেভারে রঙ এর বিভিন্ন নকশা ওড়াউড়ি করছে। এদিকে আমার ঘাড় পেঁচিয়ে হেডফোন ও তার দুমড়ে মুচড়ে একাকার। সারা ঘর প্রায় অন্ধকার। জানলার পর্দা উড়িয়ে উড়িয়ে বৃষ্টিমাখা শীতল বাতাসের ছটা আসছে। ব্যালকনির দরজা দিয়েও হু হু ঠান্ডা যেনো ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। বাইরে বৃষ্টির মতো শব্দ, আকাশে গুরুগুরু মেঘও ডাকছে একটু পরপর। কিছুটা ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলাম। এখন কি সকাল না রাত? ঘর অন্ধকার কেন? বাইরে বৃষ্টি, সাথে হিমেল বাতাস কোত্থেকে এলো? নাকি স্বপ্নের মধ্যেই আছি?
মোবাইল আনলক করলাম, দেখি সাড়ে আটটা বাজে। অর্থাৎ সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু আবহাওয়া এমন কেন? কালকেও তো ব্যাপক রোদ আর গরম ছিলো। হঠাৎ আজ কী হলো? চোখে ঘুম তখনও ঢুলে পড়ছে। আড়মোড়া নিয়েই ল্যাপটপ বন্ধ করলাম। বুঝলাম, হেডফোনে গান শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম রাতে। ভাগ্যিস বালিশের মতো ঐটারে কিক আউট করিনি বিছানা থেকে। পুরো ঘর একেবারে ঠান্ডা হয়ে আছে। হঠাৎ আবার হিমেল বাতাসের ঝাপটা খেয়েই মনে হলো, আরে বৃষ্টি হচ্ছে তো! অমনি তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই ছুটলাম ব্যালকনিতে।
বাইরে বৃষ্টির চাইতে বাতাস বেশি। বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ করে, কিন্তু বাতাস বইছে অনেক জোরে। গা ঝেড়ে উঠে ব্যালকনিতে যেতে যেতেই ভাবছিলাম, আজকে পেয়েছি তোকে, আজ ভিজব একেবারে কাকভেজা হয়ে। বৃষ্টির চেহারা দেখে সে ইচ্ছা দমে গেলো। এইরকম বৃষ্টিতে ভিজে মজা নাই। ব্যালকনির গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে গেলাম। এখান থেকে আকাশে তেমন দেখা যায় না, যতটুকু আছে তার পুরোটাই ধূসর মেঘে ঢাকা। আকাশের দিকে তাকালে বৃষ্টি দেখা যায় না, শুধু মেঘলা আবরণ। বৃষ্টিকে দৃষ্টিবন্দী করছে পাশের দালান, দালানের ছাদ, জানলা, ব্যালকনি, বাতাস, ভেজাপথ এইসব আরকি। সামনে একটা নতুন দালান উঠছে। ব্যালকনি থেকে সেটার ছাদের দিকে তাকাই। উঠতি কলাম এর রড-সিমেন্ট-কাঠের তৈরি কংকালসার অবয়ব চুপ করে ভিজছে। ছাদে বিক্ষিপ্তভাবে এখানে সেখানে পানির জটলা লেগে গেছে। সেগুলোর উপরে হৈহুল্লোড় করে আরও আরও পানির কণা নেমে আসছে দলবেঁধে। পড়ন্ত কণাগুলোর দিকে খেয়াল করি। কেউ কারও পিছু নিয়েছে কিনা, ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারি না। অসংখ্য কণাদের ভীড়ে দৃষ্টিভ্রম হতে থাকে। চোখের সামনে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো লুকোচুরি খেলতে থাকে, আমি কাউকেই শনাক্ত করতে পারি না।
ধীরে ধীরে ধূসর সকালের শরীরে আঁধার আরও জেঁকে বসতে থাকে, দেখে মনে হয় যেনো ভুল করে চারপাশে হঠাৎ সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বৃষ্টির গতিবেগ বাড়েও না, কমেও না তেমন। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেই। বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা জমতে থাকে হাতের পিঠে। ঠান্ডা পানির স্পর্শে আর বাতাসের ঝাপটায় কেঁপে উঠি একটু পরপর। চারপাশে কোনো আওয়াজ নেই তেমন, শুধু অনেকক্ষণ পর দেখি একটা ট্রাক তারস্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে পাশের রাস্তা দিয়ে চলে যায়। যাবার সময় রাস্তার পানিগুলো দুইপাশে ছিটকে দিয়ে যায়। পাশের দালানের জানলাগুলো এখন সব ভেড়ানো, ঘরে পানি ঢুকবে বলে হয়তো। অস্পষ্ট বোঝা যায়, যেনো কাচগুলো গলে গলে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচে, ঠিক বরফের মতো। কিন্তু কখনই ফুরিয়ে যাচ্ছে না। গলিত কাচের নিচে ঘষা কাচ, তার নিচেও ঘষা কাচ।
একসময় বৃষ্টির শব্দ আর কানে আসে না যদিও বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দও টের পাই না। সব যেনো দূরে সরে যাচ্ছে। দালান, জানলা, সময় সবই যেনো অন্য কোথাও, অন্য কোনো ক্যানভাস। অনেক অনেক কথা মনে পড়তে থাকে। সবগুলো জমতে থাকে রাস্তার খন্দে জমতে থাকা বৃষ্টির মতো। আর আমি সেই খন্দে পা দিয়ে পানি ছিটিয়ে, উপচিয়ে হাঁটতে থাকি। পানির দলা ভেঙ্গে গিয়ে জানলার পাশের কচুগাছ হয়ে যায়। বৃষ্টি জমিয়ে পানির বল বানিয়ে বানিয়ে আমি খেলা করি কচুপাতায় বেখেয়ালে। পানি উপচে পড়ার শব্দ আমাদের ভাড়া বাসার টিনের বারান্দার কোণা হয়ে যায়। অবিরাম বর্ষণের ঢাল টিনের চালা জুড়ে হুড়মুড়িয়ে গড়ে গড়ে সেই কোণা দিয়ে সিড়িতে পড়তে থাকে জলপ্রপাতের মতো। সিড়ির ঢালের সাথে একটা পেয়ারা গাছের ডালে বাঁদরের মতো ঝুলে ঝুলে সেই জলপ্রপাতকে লাত্থি দিয়ে প্রহার করতে থাকি, আম্মু তেড়ে আসার আগ পর্যন্ত। একই বৃষ্টির ফোটা অন্য এক আমার গায়ে এসে পড়ে। স্কুলে যাওয়ার সময় কাঁদামাখা রাস্তায় পলিথিন মোড়ানো মাথা আর বই কে নিয়ে বৃষ্টি সুবিধা করতে পারে না, আর তাই উপর্যুপরি হাতে, পিঠে, বুকে, পায়ে ঝরতে থাকে অঝোরভাবে। কোনো কোনোদিন আব্বুর সাথে মোটরবাইকে যাওয়ার পথে মুষলধারে বর্ষণের খপ্পরে পড়ি। ঠান্ডা বাতাসে আমি জাপটে আব্বুর শার্টের কোণা ধরে রাখি। একসময় মাটির রাস্তা গলে বাইক আর নড়ে না। বাধ্য করে আমাকে বৃষ্টি কাঁদামাটির মধ্যে নামায়। দুইজন মিলে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাই বাইক, আর বৃষ্টির ক্রুর হাসিতে ক্রুদ্ধ হতে থাকি অনবরত।
ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা বৃষ্টির জলাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্কুল মাঠের মতো। বৃষ্টি আমাদের অবাধ্য হতে প্ররোচনা দেয়। আমরা অবোধ হয়ে শিক্ষকের বেত, আম্মুর চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্যাগে ভরে রেখে মাঠে নেমে যাই ক্লাসের ফাঁকে, টিফিন পিরিয়ডে। সাথে থাকে কখনও ফুটবল, কখনও দৌড়, কখনও গোল্লাছুট, কখনও শুধু গড়াগড়ি। জুতোর মধ্যে প্যাচপ্যাচে কাঁদা আর মোজায় বুনোঘাসের কাঁটা ভরে যখন ফিরি তখন হুঁশ হয় আমরা মাতাল হয়েছিলাম। ভেজা লাল টকটকে চোখ দেখে স্যারেরা সে বিষয়ে নিশ্চিত হোন, আমরা মাতাল। আমাদের পিঠে হাইজাম্প লংজাম্প খেলে গরু পেটানো কঞ্চি লাগাতার। স্যার ক্লান্ত হয়ে যান একসময়। কিন্তু বৃষ্টি ক্লান্ত হয় না, আমাদের লাল চোখ ক্লান্ত হয় না। আমরা আবার মাতাল হই।
এইসব বৃষ্টির ঘোর এর শুরু আমি টের পাই না কখনই। সব কেবল আমাকে মাঝপথে এনে ফেলে দেয়। হুট করে আমি হাটঁতে থাকি নদীর পাড় ধরে কিংবা চরে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটায় নদীর ঢেউ পথ হারিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। কেবল টুপটাপ লাফাতে থাকে একই জায়গায় গতিপ্রবাহ ভুলে। চরের নরোম বালি ভিজে ভিজে আরও নরোম হতে থাকে। আমার পদচিহ্নগুলো টিপে টিপে চোরাবালি খুজতে থাকে বিস্ময় নিয়ে। আমি বৃষ্টির ঢেউ দুলতে দেখি বাতাসে, ঘ্রাণে। আর সে ঢেউ দেখতে দেখতে চোরাবালিতে লুকোচুরি খেলার সুযোগ খুজি বৃষ্টির সাথে। চোরাবালি আমাকে কেবল মরীচিকা দিয়ে যেতে থাকে, আমি নাগাল পাই না।
এইভাবে বৃষ্টিদিনের স্থির মেঘের মতো একসময় স্থবির হয়ে আসি। জমাট বাঁধা সব, সবকিছু কেবল সাগরের ফুঁসে ওঠা ঢেউ এর মতো হন্যে হয়ে পাড় খুজতে থাকে, ভাঙ্গবে বলে। অথচ আর কখনও ভেঙ্গে যাওয়া হয় না। ফুঁসে উঠে উঠে এইসব বিস্মরণ কেবল নৈঃশব্দ্যমেঘ তৈরি করে চলে। বৃষ্টি ধরে ধরে আমার মেঘগুলো গান হয়ে যায় আরও সব বৃষ্টি মেঘের সাথে। আর আমি সেই গানের টুকরো-লুপে বন্দী হয়ে ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো বাজতে থাকি কেবল- “আকাশে ছড়ানো মেঘের কাছাকাছি”।
(এপ্রিল,৬, ২০১২-শুক্রবার)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন