- মামা, এই মোড়ের লগে যেই দুকানডা আছে না, এইহানে বনরুটির দাম রাহে সাত ট্যাহা।
- জ্বী? কী বললেন?
- ঐখানে বনরুটি পাওন যায়, দাম সাত ট্যাহা। কিন্তু আইজ খাওয়ার পরে দুকানদার আট ট্যাহা রাইখা দিলো!
- বনরুটি মানে ঐ যে পাউরুটির মতো ঐটা? সাধারণত কলা দিয়ে খায়?
- হ।
- তো আট টাকা রাখবে কেন?
- কয়, দিনের ব্যালা সাত ট্যাহা, রাইতে আট ট্যাহা। এইডা তার নিয়ম।
- ও।
তৎক্ষণাৎ আর কিছু বললাম না। আসলে বলতে ইচ্ছা করছিলো না। রিকশা করে বাসায় যাচ্ছিলাম। আজ ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। অনেকদিন পরে বেশ কিছু বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। আড্ডা দিতে দিতে হুশই ছিলো না অনেক রাত হয়ে গেছে। পরে তাড়াতাড়ি ভুরিভোজ করে যে যার মতো দৌড় দিয়েছি।
আষাঢ়ের দিনরাত্রি। আজ বেশ ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া ঠান্ডা, বাতাসে বৃষ্টিভেজা আমেজ লেগে আছে। বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হলাম। সারাদিনের বৃষ্টিতে রাস্তায় কাদা কাদা হয়ে আছে। দোকানপাট প্রায় বন্ধ। তবে টং এর দোকানগুলো এখনও খোলা। পথচারী কিংবা দোকানের মানুষ কমে গেলেও রাস্তার ব্যস্ততা কমেনি। যানজট এখনও লেগে আছে। বরং বলা যায়, এখনই গাড়ি বেশি মনে হলো আমার। রাত সোয়া এগারোটার মতো বাজে। শহরে ট্রাক আর দূরপাল্লার বাস ঢুকে পড়েছে ইতোমধ্যে। দূরের দিকে তাকালে পুরো রাস্তায় হেডলাইটের আলোর ঝলকানি। আর দুই পাশে এবং মাঝ দিয়ে (আইল্যান্ডের উপরে) সোডিয়াম বাতির রেখা। দেখে মনে হয় সাদা-লাল আলোর বৃত্তগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে আর আসছে, আর তাদেরকে দুইলেনে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ করছে ল্যাম্পোস্টগুলো।
এত গাড়ির বহরে তাই রাস্তা পার হতে বেশ সময় লাগলো। যদিও অদূরেই আমার ডান-বাম দুইপাশেই দুটো ফুট-ওভার ব্রিজ আছে। কিন্তু ভেড়ার পালের মতো সবার আগে যে ছিলো তাকে অনুসরণ করে আমরা ছয়-সাতজন সবাই নিচ দিয়েই পার হলাম ট্রাফিক সিগন্যাল বুঝে। ঐপাশে রিকশা ছিলো দাঁড়ানো বেশ কয়েকটা। আমার বাসায় যাওয়ার ভাড়া পনের টাকা। প্রথম তিনজন বিশ টাকার নিচে যাবে না। পরের জন রাজী হলো।
সামনে রাস্তায় আড়াআড়িভাবে পুলিশ চেকপোস্ট। এই রাস্তায় আগেও দেখেছি রাতে নিরাপত্তার খাতিরে দশটার পরে চেকপোস্ট দিয়ে রাখে। মাঝে মধ্যে পুলিশ থাকে। কখনও শুধু গতি কমানোর জন্যে ব্যারিকেড থাকে আড়াআড়িভাবে শুধু। দেখলাম। আজকে পুলিশ শিকার পেয়েছে বলে মনে হলো। এক মোটরবাইক আটকে জেরা করছে। হাতে কিছু কাগজপত্র। তবে এটা সাধারণ ঘটনা। আগেও অনেক দেখেছি। বরং এমনও হতে পারে যাত্রীকে হেনস্তা করতে আর কিছু উপরি খাবার জন্যে আটকেছে।
রিকশায় একা থাকলে আসলে চেয়ে চেয়ে আশেপাশের কর্মকান্ড দেখা ছাড়া আর কিছু মনে হয় করার নেই। তবে আমি আশেপাশে তো বটেই, উপরেও চোখ বোলাচ্ছিলাম। আকাশে মেঘ ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেছে, অনেকটা শরতের আকাশের মতো। জোছনার ধূসর রঙ অন্ধকারে আবছাভাবে চিত্র-বিচিত্র হয়ে ছড়িয়ে আছে। আমি অনেকটা হাঁ-করে গিলছিলাম এইসব। সেইসময় হঠাৎ-ই রিকশাওয়ালা মামার কথায় ছেদ পড়লো। যাইহোক, আলাপচারিতা শেষে আবার চুপ। দোকানটা পার হয়ে বেশ কিছুদূর চলে এসেছি ততক্ষণে। একটু পরে আবার-
- আবার চা-এর দামও রাখছে হালায় চার ট্যাহা! এমনিতে রাহে তিন ট্যাহা।
- তাই নাকি?
- হ।
- আমার মনে হয় ঐখানে দোকান একটাই তো। তাই ইচ্ছেমতো আদায় করে নিচ্ছে। আর দোকানদার জানেও যে এত রাতে তার ঐখানে ছাড়া ধারেকাছে আর কোথাও খাবার দোকান নেই।
- এক্কেরে ঠিক কইছেন মামা। কিন্তু এইডা কেমুন ইনছাফ? এমনে চললে খামু কেমনে আমরা?
- তা ঠিক। সব জায়গাতেই, যে যেভাবে পারছে মেরে কেটে খাচ্ছে। তা আপনি কি করলেন তখন?
- কী আর করুম। দিলাম। গ্যাঞ্জাম পাকায় আর কী হইবো? নিজের প্যাটরে থামায় রাহোন গেলে সবচে ভালা হইতো। সেইডাও তো পারি না।
বলার কিছু পেলাম না। চুপ করে গেলাম। রিকশায় ওঠার সময় এই মামাও বিশ টাকা চেয়েছিলো। পরে সচরাচর ভাড়া পনেরো টাকায় রাজী হয়েছে। পাঁচ টাকা কিছুই না তেমন। তবে এখন তার কাছে তার কথায় আর সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীর-মুখের ভাষায় কিছুটা আন্দাজ পেলাম দুই টাকার মূল্য। এখন তাকে বিশ টাকাই ভাড়া দেয়া উচিত কিনা সেটা নিয়ে নিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলো। অন্তত বিশ টাকা না হলেও পনেরোর সাথে দুই টাকা বাড়িয়ে দেয়া। অথবা তাকে আজকে রাতের খাবারের মূল্য ভাড়ার সাথে দেয়া? অথবা তাকে বাসায় বসিয়ে রাতের খাবার খাওয়ানো? নাকি এরকম কিছু করলে সেই রিকশাওয়ালা মামা আবার করুণা ভেবে লজ্জা পাবে? এত কিছুর মধ্যে এখন আমার কী করা উচিত ভেবে ঠিক করার আগেই বাসার গেটে পৌঁছে গেলাম।
অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও আমার কিছু করা হয়নি।
ভাড়ার পনেরো টাকাই দেয়া হয়েছিলো মাত্র।
সেরাতের আড্ডায় খাওয়ার বিলের শুধু ভ্যাট ছিলো তিনশো টাকারও বেশি।
সেরাতে বাসায় আমার জন্যে রাখা খাবারটা নষ্ট হয়েছিলো আগেই খেয়ে এসেছি বলে।
এই সব কিছুর চেয়ে দুই টাকা-টা কি বেশি ছিলো কিনা এখনও ভেবে ঠিক করা হয়নি, কিংবা হয়তো আসলে জানাই নেই আমাদের কারও।
(হয়ত গল্প, হয়ত কাহিনি, হয়ত গাঞ্জা)
[জুলাই ৫, ২০১২]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন