প্রতিদিন বিকেলে যখন প্রায় এক কিলোমিটার পথ হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরি, দিনের সূর্য ততক্ষণে শ্রান্ত হয়ে থাকে। দালান, ইলেক্ট্রিক তার, রাজপথের পাশে সারি সারি বৃক্ষ আর উড়ন্ত কাকের ডানার ফাঁকে তার দিনভিন্ন রঙগুলো উঁকি দিয়ে আমাদের বাড়িফেরা দেখতে থাকে। খাঁচাবদ্ধ একটা নার্সারিতে নাম না জানা রঙিন ফুল আর পাতাবাহারের বাগান। অর্ধচন্দ্রাকৃতি বিটুমিনের সমান্তরালে দু-তিনটি আলিশান ভিলা গম্ভীর মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে; হেঁটে চলা পথচিহ্নের দিকে। নৈকট্যের সর্বোচ্চ অধিকার নিশ্চিত করে “কুকুর হইতে সাবধান”। বিরস মুখে দাড়োয়ান বাইরে চেয়ারে একটা লাঠি নিয়ে পান চিবোয়, একজন কিংবা দুইজন।
ফুটপাথের পাশে তারস্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে জন্ম নিচ্ছে আরেকটি অট্টালিকার কংকাল। পাশে কয়েকটি বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, একেবারে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি সব আছে। সদ্যজাত থেকে সুশিক্ষিত করার সর্বময় সুব্যবস্থা। একই “মা” অনেক শরীরে অনেক অনেক শিশুদের অপেক্ষায় ইতস্তত এখানে ওখানে ছড়িয়ে। ফেরিওয়ালারা বিরক্ত মুখে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে টং এর চলমান দোকান সাজিয়ে হাওয়া গিলছে। খেয়াল করে দেখি, একটা পেয়ারার ঝুড়ি, একটা চুড়ির ঝুড়ি, একটা শসা-গাজরের ভ্যান, একটা প্লাস্টিকের খেলনা ভর্তি ভ্যান, কিছু আইস্ক্রিমের ভ্যান ইত্যাদি ইত্যাদি। একটার পর একটা গাছ প্রতিদিন এগিয়ে আসে, কোনোটারই নাম জানি না। সামনে একটি কাঁচাবাজার এবং বিপরীতে একটা মেকানিকের বাজার। মোবিল এবং গরুর বর্জ্যের নিদারুণ গন্ধে সয়লাব চারপাশ। মোড় ঘিরে রিকশাদের আস্তাবল। সাপের মতো আকাবাকা পথে পাশ কাটিয়ে যেতে হয় খুব সাবধানে। একদিন হুট করে এক রিকশার চালক প্রায় উড়ে এসে পায়ের কাছে পড়লো। সাথে সাথে রিকশা থেকে মধ্যবয়স্ক এক মহিলাও পড়ে তাঁর পা পেঁচিয়ে গেলো রিকশার চেইনের সঙ্গে। পেছন থেকে একটা প্রাইভেট কার সেই মুহূর্তে হুশ করে বেরিয়ে গেলো। থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম।
জান্নাত নামে একটা খাবারের দোকান আছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে তীব্র ঘ্রাণ এসে নাকে লাগে, মনে হয় সত্যি বেহেশতি রসনার কারবার চলছে। এইখানের চিকেন-গ্রিল মাঝে মধ্যেই খাওয়া হয়। এবং আমি এইরকম সুস্বাদু গ্রিল ঢাকায় আর কোথাও খাইনি। যেতে যেতে একদিন হুট করে হাতি দেখি। গলায় বাঁধা ঘণ্টায় টুং-টাং আওয়াজ করে হেলতে দুলতে আসছে। আচমকা মোড় নিয়ে আড়াআড়িভাবে আমার সামনে দিয়ে চলে যায়। আমি ভয় পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে যাই, হাতির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ।
এই সময়টা অনবরত সূর্য রঙ বদলাতে থাকে। আমি পা বাড়াই, আমরা হাঁটতে থাকি। সূর্য রঙ এর বিন্যাসে দালান টপকে টপকে এগুতে থাকে। একদিন মোবাইল ক্যামেরা অন করি। কাজ হয় না। ইলেক্ট্রিক তার ঝামেলা তৈরি করে। একই সূর্য তিন টুকরো হয়ে তার ঘেঁষে এগুতে থাকে, এমনকি মেঘও। মোবাইল পকেটে ঢুকাই। তার থেকে বেরিয়ে এসে জোড়া লেগে যায় তারা। আমি থমকে থেকে সূর্য-মেঘ-গোধূলির জোড়া লাগা বিস্ময় দেখি।
একটা ল্যাম্পোস্ট কীভাবে যেনো আড়ালে লুকিয়ে একটা আমগাছের মধ্যে। বাঁকা লাইটা পাতার ফাঁক দিয়ে একটু বেরিয়ে চেয়ে থাকে। বাসা থেকে তাকে দেখা যায়, কিন্তু পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নজরে আসে না প্রায় কোনোদিনই। হঠাৎ একদিন ঝুম বৃষ্টিতে আমি আর হাঁটি না। মাইক্রোতে যাওয়ার সময় জানলার কাচে দেখি ভিজে চুপসে একমনে তাকিয়ে আছে, যেদিক দিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো সেদিকে। মাইক্রোর ভেজা কাচে আমার দৃষ্টি অযথা থমকে যায় কেনোজানি।
রাস্তা ঘেঁষে বাসার কাছে একটা কাঁঠাল গাছ, বেশ বড়। প্রায় একফুট কান্ডের ব্যাস আর দুই তলার সমান উচ্চতা নিয়েও তেমন নজরে আসেনি কোনোদিন। একদিন দেখি একবারে নিচে যেখানে আমি চাইলেই হাত দিয়ে নাগাল পাবো, এমন উচ্চতায় একটা হলদে সবুজ কাঁঠালের কুঁড়ি, সাথে দুইপাশে দুইটা কচিপাতা। এরপর প্রতিদিন নজরে আসতে থাকে, একটু একটু করে বড় হয়। গায়ের রঙ থেকে সবুজ ভাব কেটে যেতে থাকে। অবাক করা ব্যাপার হলো, গাছটা নজরে আসে না, কেবল কুঁড়ির অংশটুকু ছাড়া। দিনগুলো একে একে ওর গোড়ায় জমতে থাকে, গোধূলির রঙ সমেত। তারপর একদিন দেখি ওটা নেই। নেই তো নেইই। গোড়ার কাছে সাদাটে আঠা জমে শুকিয়ে গেছে। কিছুদিনের জন্যে হেঁটে আসা আমার জমানো বিকেলগুলো হঠাৎ হারিয়ে গেছে। আমি থমকে দাঁড়িয়ে থাকি।
এক বয়স্ক এবং মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়িওয়ালা রিকশাওয়ালা পাশে চুকচুক করে চা খাচ্ছে অদূরেই, একটা টং এর দোকানের কাছে ফুটপাথে বসে। চায়ের ধোঁয়া দেখা যায় না, বিকেলের ছায়ারোদে মিশে গেছে। আচমকা তাকে মুখ ফসকে বলে বসি, “আচ্ছা মামা, এইখানে একটা ছোট্ট কাঁঠালের কুঁড়ি ছিলো না, সেটা আর নাই, হারিয়ে গেছে।” কিজানি কী হলো, কিন্তু মনে হলো যেনো, কথাটা শুনে বিষণ্ন বিকেলটা হঠাৎ থমকে গেছে ঠিক সেই মুহূর্তে।
[আগস্ট ৩০, ২০১২]
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন