শানে নুযূল
গত পরশু থেকে আবহাওয়াটা চমৎকার হওয়া শুরু করেছে। এর আগে গরমে আর ঈদ পরবর্তী মশায় অবস্থা একেবারে কাহিল হয়ে গিয়েছিলো। মেঘলা আবহ আর ঠান্ডার রেশ থাকতে থাকতে হঠাৎ কাল রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয় গুড়িগুড়ি। আগে টের পাইনি, মশার অত্যাচার থেকে বাঁচতে মশারির ভেতরে না, একেবারে ঘরের দরজা-জানালা সব খিলকপাট দিয়ে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলাম। রাত জাগা অভ্যাস আগে থেকেই ছিলো, হঠাৎ কী মনে করে দুটোর দিকে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি পড়ছে, প্রায় নিঃশব্দে।
সকালে অফিসে যাবার সময় বাসার বাইরে বের হতে গিয়েও দেখি একই অবস্থা। বরং ততক্ষণে বেগ আরও বেড়ে গেছে বৃষ্টির, এখন আর গুড়িগুড়ি পড়ছে না। একেবারে বৃষ্টির মতোই পড়ছে। বাতাসে স্নিগ্ধ হিমেল আবহ। প্রাণটা জুড়িয়ে গেলেও মেজাজ গেলো খারাপ হয়ে। ছুটির দুই দিন গরমে সেদ্ধ বেগুনভাজা হয়ে কাটিয়ে দিলাম, তখন কিছু হলো না। আর আজ অফিস শুরু, এমন সময় এমন ঘুমকাতুরে আবহাওয়ার অবতারণা, পুরো দিনটাই মাটি হবে মনে হচ্ছিলো, হলোও তাই। এমন দিনে গরম গরম ইলিশ খিচুড়ি খেয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমাবো, কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে ভেজা পলিথিনের মতো চপচপে হয়ে হাঁটতে হাঁটতে দিশেহারা বাতাসের মতো ঘুরে বেড়াবো নিরুদ্দেশ। নাতো এখন ফুলবাবু সেজে ছুটতেছি কামলা খাটতে, এর কোনো মানে হয়?
অফিসের প্রায় পুরোটা সময় গেলো আবহাওয়ার বিষণ্নতাকে ছাপিয়ে নিজের কর্মব্যস্ততা জাহির করতে করতে। অবশ্য কাজের চাপ যে খুব একটা ছিলো তা নয়। কিন্তু ঘুমে প্রায় টলে পড়তেছিলাম। চরম হাঁসফাস অবস্থা। মনে হচ্ছিলো একটু যদি মুক্তি পেতাম এখন, হয় এখন ঘুমের দেশে উড়াল দিতাম অথবা বৃষ্টির মধ্যে দিতাম ঝাঁপ, কী আছে কপালে। একঘেয়েমি কাটাতে একসময় ফেসবুকের ফিডগুলো দেখা শুরু করলাম। দেখি আশরাফ ইতোমধ্যে একটা অসাধারণ ছবি শেয়ার করেছে, “freedom” থিমের। একটা প্যাডেলহীন সাইকেল, দুই চাকা “freedom” লেখা দিয়ে আটকা; সৃষ্টিশীল অভিনব নকশার জারিজুরি। তব্দা খেয়ে আটকে থাকলাম ছবিটিতে অনেকক্ষণ ধরে।
আমার অথর্ব মাথাটা পুরো বিগড়ে দিলো বরবাদ এই আশরাফ হঠাৎ-
"ছোটবেলায় আমার একটা সাইকেল আছিলো। সেইটায় চইড়া কই কই যাউতাম গা। তবে ঢাকায় চালাইয়া জুইত পাইতাম না। গ্রামে গেলে গ্রামের রাস্তায় অনেক জোরে ফাঁকা মাটির রাস্তায় যেই খানে খুশি যাইতাম গা। রাস্তা শেষ হইবোনা, আমি যাইতেছি। একটা সময়ে প্যাডেল বন্ধ কইরা দিতাম। সাইকেল চলতেই থাকতো।"
আমার এইদিনের মাথায় শেষ পেরেক ঠুকে দিলো বরবাদটা।
কাহিনির শুরু
ছোটোবেলায় যখন ক্লাস ওয়ানে ছিলাম তখন মুক্তি কি কিংবা স্বাধীন কি তা ঠিকঠাক জানা ছিলো না। তখন মুক্তি কিংবা স্বাধীন বলতে আমার কাছে ছিলো তিনটি জিনিস। এক, আব্বুর দেয়া আমার জীবনে প্রথম টেনিস বল (অনেক আগে কিনে দিলেও তখন অবধি ছাল ওঠা অবস্থায় টিকে ছিলো)। দুই, আব্বুর মোটরবাইকের পেছনের চাকার একটা পরিত্যক্ত টায়ার। আর তিন, সেজো চাচার পুরোনো আমলের একটা বিশাল “রয়েল” সাইকেল। এই সাইকেলেই আমি সাইকেল চড়া শিখি। চাচা সকালে হাটে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেতেন, ফিরতেন বিকেলে। ছুটির দিনে আর প্রতি বিকেলে এই সাইকেলই ছিলো আমার মুক্তি, আমার স্বাধীনতা।
তখন সাইকেলটার তুলনায় আমি এত ছোট ছিলাম যে, দুই হাতে দুই হ্যান্ডেল ধরলে আমার হাত আমার মাথার উপরে থাকতো। অনেকটা কার্নিশ ধরে ঝোলার মতো। সেটা চালানো শিখতে গিয়ে পুরো হিমশিম খেতে হয়েছিলো প্রথম প্রথম। আমি সিটে বসে চালানো শিখি নাই তখনও, কেননা তা সম্ভব ছিলো না। সিটে আমাকে বসতে হলে আরেকজন বড় মানুষ লাগবে যে আমাকে সিটের উপরে তুলে দিবে! উপরন্তু একবার তুলে দিলে আমার পা প্যাডেলে পৌঁছাতে বাঁশ দিয়ে জোড়া লাগাতে হবে। আমি সাইকেল চালানো শিখেছিলাম সিটে না বসে। সামনের রডের ফাঁক দিয়ে একপাশে ঝুলে! অনেকের কাছেই ব্যাপারটা অপরিচিত লাগতে পারে কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এইটা অহরহ দেখা যায়। বিশেষত ছোট ছোট পিচ্চিরা বড় সাইকেলে এভাবে চালানো শিখে। আমিও ওইভাবেই শিখেছিলাম। আর শিখতে গিয়ে কত যে আছাড় খেয়েছি তা আর বলাই বাহুল্য। এইখানে মজার কিংবা বেশ উদ্ভট একটা ব্যাপার হচ্ছে সেই বয়সে আকারে সাইকেলের তুলনায় যথেষ্ট ছোট থাকায় আমি পাশে ঝুলেও অন্যদের মতো মাথা হ্যান্ডেলয়ের উপরে তুলে তাকাতে পারতাম না। আমি তাকাতাম সামনে হ্যান্ডেলের নিচে দিয়ে!
আমার বাসার পেছন দিয়েই পাড়ার রাস্তা ছিলো। সেটা গিয়ে ঠেকেছিলো গ্রামের প্রধান সড়কের উঁচু ঢালে। প্রধান সড়কের পাশেই সমান্তরালে বহমান প্রমত্তা পদ্মা। বন্যা এড়াতেই সে সড়ক ছিলো অনেক উঁচুতে, অন্যান্য ভেতরের রাস্তার তুলনায়। প্রধান সড়কের সাথে ঢালের কাছেই ছিলো ছোটখাটো একটা পুকুর, ডোবা বললেও চলে। তো আমার এবং আমার বয়েসী আরও দুই তিনজন সাঙ্গপাঙ্গের কাজ ছিলো সাইকেল নিয়ে চক্কর দেয়া; বাসা থেকে ঢালে প্রধান সড়ক পর্যন্ত। মাঝে মাঝে কেউ না এলে আমি একাই চক্কর দিতাম। ঢালে উঠতে জোরে প্যাডেল দেয়া লাগতো, নাহলে ওঠা তো যেতোই না বরং পড়ে যাওয়ার আগেই নেমে যেয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো। একবারতো তালগোল পাকিয়ে পুরো সাইকেল সমেত পড়ে গিয়েছিলাম ঢালের সে পুকুরের খাদে। ভাগ্যিস জলে পড়িনি, কেননা সাঁতার জানতাম না। তাহলে আজ হয়তো এখনও সেই পুকুরের তলেই সাইকেল নিয়ে ভেসে বেড়াইতাম।
আম্মুর কড়া মানা ছিলো, প্রধান সড়কে সাইকেল চালানো যাবে না। তাই কখনও সেখানে চালাইনি সে বয়সে। ঢালে উঠে গিয়েই আবার উলটো নেমে যেতাম সঙ্গে সঙ্গে। মাঝে মাঝে ঢালে উঠে নেমে থেমে থেকে আড়াআড়ি সড়কে দূরপানে চেয়ে দেখতাম। নদীর মতোই অনেক দূরে যেতে যেতে একসময় পুবে-পশ্চিমে দুই দিকেই বাড়িঘর আর সারিসারি গাছপালার মধ্যে মিশে গেছে সড়কটা। ওই পথেই দৈনিক আব্বু অফিসে যেতেন। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে সাইকেল নিয়ে আব্বুর পিছু ধাওয়া করতাম, ওই ঢাল পর্যন্ত। তারপর আব্বু মোটরবাইকের দ্রুমদ্রুম আওয়াজ করতে করতে সড়কের সাথে মিশে যেতেন একসময়। সেদিকে চেয়ে চেয়ে দেখার পর ঢাল থেকে আবার নেমে আসতাম। ওঠার সময় কষ্ট হলেও নামার সময় ছিলো একেবারেই সহজ, কেবল হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকো কোনোমতে। সাইকেলই গড়গড়িয়ে নেমে আসতো ঢাল থেকে অনেকদূর, অনেকক্ষণ ধরে; উপরে থেকে গড়িয়ে পড়া পানির স্রোতের মতো।
সিটে উঠে সাইকেল চালানো শিখি অনেক পরে। আমার চাচাতো ভাইয়ের একটা “চায়না-ফনিক্স” ছিলো, মূলত ওইটাতে আমি সিটে চড়া শিখি ভালোমতো। সাইকেল চালাতে পারলেও আমি চালানোর নিয়ম কানুন অনেকদিন পর্যন্ত কিছুই জানতাম না। যেমন রাস্তার কোনপাশ দিয়ে চালাতে হবে, কীভাবে ব্রেক করার আগে পেছনে সংকেত দিতে হবে, কিভাবে মোড়ে ঘুরতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আব্বু বা অন্যদের নিয়মিতই দেখেছি রাস্তার বামপাশ দিয়ে চালাতে, কিন্তু এইটাই যে নিয়ম তা আমার জানা ছিলো না তখন। আমার ধারণা ছিলো, উনারা ইচ্ছা করে বাম দিক দিয়ে চালান। আর তাই আমি দিকের তোয়াক্কা না করে সেইসময় ইচ্ছেমতো কখনও বামে, কখনও ডানে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তার মাঝ বরাবর ছুট দিতাম।
হিরো-জেট জীবন
আমার প্রথন সাইকেল আমি উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম, মেজো মামার কাছে থেকে। সেইটা ক্লাস সিক্সে ওঠার সময়, কথা ছিলো ক্লাস ফাইভে আমি ভালো রেজাল্ট করলে মামা আমাকে একটা সাইকেল গিফট দেবেন। সাইকেল পাওয়ার সংগ্রামে কিংবা বন্ধুদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রেই কিনা কেজানে, ধুম করে ক্লাস সিক্সে ফার্স্ট হয়ে গেলাম! এবং তার কিছুদিন পরেই মামা পাঠিয়ে দিলেন পলিথিনে মুড়িয়ে লাল টকটকে মাঝারি সাইজের একখান “হিরো-জেট”। কী সাইকেল নিবো এইটা মামাই ঠিক করতে বলেছিলেন আমাকে। চারিদিকে তখন “চায়না-ফনিক্স”-এ ছড়াছড়ি। এর মাঝে স্কুলে দেখি আমার এক বন্ধুর একটু অন্যরকম সাইকেল, দেখতে বেশ সুন্দর। সবচেয় বড় কথা এইটা আমাদের শরীরের সাথে মানানসই। বেশি বড়ও না, বেশি ছোটও না। ওইটা দেখে পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো। আর তাই ঐটারই নাম দিয়েছিলাম মামার কাছে।
এই সাইকেলটা আমার কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। ঐ সময় আমরা দাদুবাড়ি ছেড়ে স্কুলের কাছে চলে আসি, বাসাভাড়া নিয়ে। স্কুলে হেঁটে যেতে দশমিনিট। তাও প্রায়ই স্কুলে সাইকেল নিয়ে যেতাম। খেলার ফাঁকে বা সময় পেলেই সাইকেল নিয়ে চলমান আড্ডা শুরু হয়ে যেতো বন্ধুদের সাথে। এইসময় আর আম্মুর নিষেধ ছিলো না। একেবারে রাজপথে চালাতাম সাইকেল। যারা দূর থেকে সাইকেল নিয়ে আসতো, তাদের দেখে মনে হতো ইশ! আমার বাসা আরেকটু দূরে যদি হতো। তাইলে আরও বেশি বেশি চড়ে আসতাম। আরও বেশি করে সাইকেল চালাতে চালাতে গল্প করা যেতো সবার সাথে।
মাঝে মাঝে আমাদের মাঝে হতো প্রতিযোগিতা, কে জেতে। আমার মতো হাতে গোনা কয়েকজনের মাঝারি সাইজের সাইকেল ছিলো, বাকিদের ফনিক্স। ফলে জিততে আমাদের বেশ বেগ পেতে হতো। কেননা সাইকেল বড় হলে যে চালিয়ে যেতে এবং গতিতে মজা তা তখন টের পেয়েছিলাম। তবে এটা নিয়েও রেসে আমি হেরেছি খুব কম। ছোটার সময় কারও হুশ থাকতো না। সীমানা আগেই বলা থাকলেও হয়তো দেখা যেতো ছুটতে ছুটতে আরও বহুদূর চলে গেছি।
তবে রাজপথে জোরে না, আস্তে আস্তে হেলেদুলে সাইকেল চালাতে বেশি মজা। কেবল ট্রাক-বাস না থাকলে নিজেকেই পথের রাজা মনে হয়। আরেকটা ব্যাপার হলো, বিটুমিনের রাস্তায় কেনোজানি সাইকেলের আসল মজা পেতাম না, এখনও পাই না। সাইকেলের আসল মজা মাটির রাস্তায়, গ্রামের পথে। দাদুবাড়ি ঘুরতে যাওয়ার সময় কিংবা বাসার আশেপাশে চালানোর সময় এই মজাটা পেতাম। কেমন একটা মৃদুছন্দে দুলতে দুলতে এগিয়ে যায় এবড়ো-থেবড়ো মাটির সাথে ঘষে ঘষে, অনুভূতিটাই অন্যরকম। আর চালানোর সময় অনেকরকম কারিগরি করা, সবই মনের আনন্দে। কখনও শুরুতেই হঠাৎ হুট করে তীব্র বেগে প্যাডেল ঘুরিয়ে তারপর আরামসে ছেড়ে দিতাম পা। চাকার সাথে প্যাডেলও বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকতো সমানে। আবার কখনও সাইকেলের বেগ একটু বাড়িয়ে নিয়ে তারপর উলটা দিকে প্যাডেল ঘুরাতাম। এইটাও মজার, যেনো আমি চালাচ্ছি পেছনে, অথচ সাইকেল যাচ্ছে সামনে। আর সাথে চেইন উলটো ঘুরানোর রিরিরিরি শব্দ; পুরোই অদ্ভুত।
উঠতি বয়সে ভাবের শেষ থাকে না। সেরকম আরেকটা ভাব ছিলো পেছনের ক্যারিয়ারে বসে চালানো। হুদাই মুখে উদাস উদাস একটা ভাব এনে ক্যারিয়ারে বসে আরামে প্যাডেল ঘুরাতাম মাঝে মাঝে। আম্মু দেখে বলতো, বাপরে স্টাইল!!! আবার কখনও আমির খানের মতো দুই হাত ছেড়ে দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে চালানো। আমি চুল না আঁচড়ালেও হাত ছেড়ে দিয়ে অনেক চালিয়েছি। অবশ্য বেশিদূর যেতে পারতাম না। তাও আমার কেরামতি দেখে কে? সাইকেল চালানোর আরেকটা বিশাল স্টাইল ছিলো এটাতে আরোহন পদ্ধতি। সাধারণত সবাই সিটে চড়ে বসে তারপর চালানো শুরু করে। আমাদের মধ্যে এ নিয়ে হতো প্রতিযোগিতা। কে কত বিচিত্র এবং ভাবযুক্ত উপায়ে সাইকেলে আরোহন করতে পারে চালানোর আগে তা নিয়ে। কেউ বাম দিকে দিয়ে, কেউ ডানপাশ দিয়ে, কেউ কিছুদূর দৌড়ে নিয়ে লাফিয়ে, কেউ আবার দুই পা-ই একপাশে ঝুলিয়ে ইত্যাদি বহুরকম কারসাজি দেখাতো। আমি অবশ্য এইটার কৌশল বেশিরকম পারতাম না। আমি সিটে চড়ে বসেই চালাতাম বা চালাই বেশি।
আমার সাইকেল চালানোর জায়গা ছিলো মূলত আশেপাশে গ্রাম্য কাঁচারাস্তা, স্কুলের মাঠ, দাদুবাড়ির রাস্তা, বাজারের রাস্তা আর প্রধান রাজপথ। এইগুলোতেই ঘুরে ফিরে সাইকেলে চড়ে কেটে গেছে আমার অসংখ্য বিকেলবেলা। প্রতিদিন একইরকম, অথচ প্রতিদিনই নতুন, অনাবিল আনন্দদায়ী। সাইকেল নিয়ে চেনা পথেই নিত্য আমি নেমে যেতাম হারিয়ে যেতে, হারিয়ে গিয়ে।
অতঃপর
আজকেই আবার আরেক বন্ধুবর কেয়া ম্যাডামের সাথে কথা বলে জানলাম, তিনি সাইকেল কিনেছেন। আবাসস্থান অর্থাৎ কোয়ার্টারে চালাবেন বলে। আশরাফের কথায় মাথা নিরেট হয়ে গিয়েছিলো স্মৃতিতে। কেয়ার সাইকেলের কথা শুনে সেই নিরেট মাথার মধ্যে স্মৃতিগুলো গুলিয়ে গুলিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে সামনে আসতে থাকলো একে একে। নিতান্ত তুচ্ছ, নগন্য; অথচ কত জীবন্ত সেসব এক একটি দিন, এক একটি ছেলেবেলা। আমার এক একটি সাইকেল বেলা। সেই সাইকেলটি বাসায় এখনও আছে। ওর পিঠে চড়ে কেটে গেছে আমার কৈশোর, আমার ছোট দুই ভাইয়েরও কৈশোর। এখনও আমরা সেটা চালাই। এখনও সেটা সময় কাটিয়ে যাচ্ছে তার চিরচেনা বন্ধুদের সাথে।
(নভেম্বর ৪, ২০১২)
গত পরশু থেকে আবহাওয়াটা চমৎকার হওয়া শুরু করেছে। এর আগে গরমে আর ঈদ পরবর্তী মশায় অবস্থা একেবারে কাহিল হয়ে গিয়েছিলো। মেঘলা আবহ আর ঠান্ডার রেশ থাকতে থাকতে হঠাৎ কাল রাত থেকে বৃষ্টি শুরু হয় গুড়িগুড়ি। আগে টের পাইনি, মশার অত্যাচার থেকে বাঁচতে মশারির ভেতরে না, একেবারে ঘরের দরজা-জানালা সব খিলকপাট দিয়ে নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলাম। রাত জাগা অভ্যাস আগে থেকেই ছিলো, হঠাৎ কী মনে করে দুটোর দিকে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি পড়ছে, প্রায় নিঃশব্দে।
সকালে অফিসে যাবার সময় বাসার বাইরে বের হতে গিয়েও দেখি একই অবস্থা। বরং ততক্ষণে বেগ আরও বেড়ে গেছে বৃষ্টির, এখন আর গুড়িগুড়ি পড়ছে না। একেবারে বৃষ্টির মতোই পড়ছে। বাতাসে স্নিগ্ধ হিমেল আবহ। প্রাণটা জুড়িয়ে গেলেও মেজাজ গেলো খারাপ হয়ে। ছুটির দুই দিন গরমে সেদ্ধ বেগুনভাজা হয়ে কাটিয়ে দিলাম, তখন কিছু হলো না। আর আজ অফিস শুরু, এমন সময় এমন ঘুমকাতুরে আবহাওয়ার অবতারণা, পুরো দিনটাই মাটি হবে মনে হচ্ছিলো, হলোও তাই। এমন দিনে গরম গরম ইলিশ খিচুড়ি খেয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে ঘুমাবো, কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে ভেজা পলিথিনের মতো চপচপে হয়ে হাঁটতে হাঁটতে দিশেহারা বাতাসের মতো ঘুরে বেড়াবো নিরুদ্দেশ। নাতো এখন ফুলবাবু সেজে ছুটতেছি কামলা খাটতে, এর কোনো মানে হয়?
অফিসের প্রায় পুরোটা সময় গেলো আবহাওয়ার বিষণ্নতাকে ছাপিয়ে নিজের কর্মব্যস্ততা জাহির করতে করতে। অবশ্য কাজের চাপ যে খুব একটা ছিলো তা নয়। কিন্তু ঘুমে প্রায় টলে পড়তেছিলাম। চরম হাঁসফাস অবস্থা। মনে হচ্ছিলো একটু যদি মুক্তি পেতাম এখন, হয় এখন ঘুমের দেশে উড়াল দিতাম অথবা বৃষ্টির মধ্যে দিতাম ঝাঁপ, কী আছে কপালে। একঘেয়েমি কাটাতে একসময় ফেসবুকের ফিডগুলো দেখা শুরু করলাম। দেখি আশরাফ ইতোমধ্যে একটা অসাধারণ ছবি শেয়ার করেছে, “freedom” থিমের। একটা প্যাডেলহীন সাইকেল, দুই চাকা “freedom” লেখা দিয়ে আটকা; সৃষ্টিশীল অভিনব নকশার জারিজুরি। তব্দা খেয়ে আটকে থাকলাম ছবিটিতে অনেকক্ষণ ধরে।
আমার অথর্ব মাথাটা পুরো বিগড়ে দিলো বরবাদ এই আশরাফ হঠাৎ-
"ছোটবেলায় আমার একটা সাইকেল আছিলো। সেইটায় চইড়া কই কই যাউতাম গা। তবে ঢাকায় চালাইয়া জুইত পাইতাম না। গ্রামে গেলে গ্রামের রাস্তায় অনেক জোরে ফাঁকা মাটির রাস্তায় যেই খানে খুশি যাইতাম গা। রাস্তা শেষ হইবোনা, আমি যাইতেছি। একটা সময়ে প্যাডেল বন্ধ কইরা দিতাম। সাইকেল চলতেই থাকতো।"
আমার এইদিনের মাথায় শেষ পেরেক ঠুকে দিলো বরবাদটা।
কাহিনির শুরু
ছোটোবেলায় যখন ক্লাস ওয়ানে ছিলাম তখন মুক্তি কি কিংবা স্বাধীন কি তা ঠিকঠাক জানা ছিলো না। তখন মুক্তি কিংবা স্বাধীন বলতে আমার কাছে ছিলো তিনটি জিনিস। এক, আব্বুর দেয়া আমার জীবনে প্রথম টেনিস বল (অনেক আগে কিনে দিলেও তখন অবধি ছাল ওঠা অবস্থায় টিকে ছিলো)। দুই, আব্বুর মোটরবাইকের পেছনের চাকার একটা পরিত্যক্ত টায়ার। আর তিন, সেজো চাচার পুরোনো আমলের একটা বিশাল “রয়েল” সাইকেল। এই সাইকেলেই আমি সাইকেল চড়া শিখি। চাচা সকালে হাটে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যেতেন, ফিরতেন বিকেলে। ছুটির দিনে আর প্রতি বিকেলে এই সাইকেলই ছিলো আমার মুক্তি, আমার স্বাধীনতা।
তখন সাইকেলটার তুলনায় আমি এত ছোট ছিলাম যে, দুই হাতে দুই হ্যান্ডেল ধরলে আমার হাত আমার মাথার উপরে থাকতো। অনেকটা কার্নিশ ধরে ঝোলার মতো। সেটা চালানো শিখতে গিয়ে পুরো হিমশিম খেতে হয়েছিলো প্রথম প্রথম। আমি সিটে বসে চালানো শিখি নাই তখনও, কেননা তা সম্ভব ছিলো না। সিটে আমাকে বসতে হলে আরেকজন বড় মানুষ লাগবে যে আমাকে সিটের উপরে তুলে দিবে! উপরন্তু একবার তুলে দিলে আমার পা প্যাডেলে পৌঁছাতে বাঁশ দিয়ে জোড়া লাগাতে হবে। আমি সাইকেল চালানো শিখেছিলাম সিটে না বসে। সামনের রডের ফাঁক দিয়ে একপাশে ঝুলে! অনেকের কাছেই ব্যাপারটা অপরিচিত লাগতে পারে কিন্তু গ্রামাঞ্চলে এইটা অহরহ দেখা যায়। বিশেষত ছোট ছোট পিচ্চিরা বড় সাইকেলে এভাবে চালানো শিখে। আমিও ওইভাবেই শিখেছিলাম। আর শিখতে গিয়ে কত যে আছাড় খেয়েছি তা আর বলাই বাহুল্য। এইখানে মজার কিংবা বেশ উদ্ভট একটা ব্যাপার হচ্ছে সেই বয়সে আকারে সাইকেলের তুলনায় যথেষ্ট ছোট থাকায় আমি পাশে ঝুলেও অন্যদের মতো মাথা হ্যান্ডেলয়ের উপরে তুলে তাকাতে পারতাম না। আমি তাকাতাম সামনে হ্যান্ডেলের নিচে দিয়ে!
আমার বাসার পেছন দিয়েই পাড়ার রাস্তা ছিলো। সেটা গিয়ে ঠেকেছিলো গ্রামের প্রধান সড়কের উঁচু ঢালে। প্রধান সড়কের পাশেই সমান্তরালে বহমান প্রমত্তা পদ্মা। বন্যা এড়াতেই সে সড়ক ছিলো অনেক উঁচুতে, অন্যান্য ভেতরের রাস্তার তুলনায়। প্রধান সড়কের সাথে ঢালের কাছেই ছিলো ছোটখাটো একটা পুকুর, ডোবা বললেও চলে। তো আমার এবং আমার বয়েসী আরও দুই তিনজন সাঙ্গপাঙ্গের কাজ ছিলো সাইকেল নিয়ে চক্কর দেয়া; বাসা থেকে ঢালে প্রধান সড়ক পর্যন্ত। মাঝে মাঝে কেউ না এলে আমি একাই চক্কর দিতাম। ঢালে উঠতে জোরে প্যাডেল দেয়া লাগতো, নাহলে ওঠা তো যেতোই না বরং পড়ে যাওয়ার আগেই নেমে যেয়ে ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো। একবারতো তালগোল পাকিয়ে পুরো সাইকেল সমেত পড়ে গিয়েছিলাম ঢালের সে পুকুরের খাদে। ভাগ্যিস জলে পড়িনি, কেননা সাঁতার জানতাম না। তাহলে আজ হয়তো এখনও সেই পুকুরের তলেই সাইকেল নিয়ে ভেসে বেড়াইতাম।
আম্মুর কড়া মানা ছিলো, প্রধান সড়কে সাইকেল চালানো যাবে না। তাই কখনও সেখানে চালাইনি সে বয়সে। ঢালে উঠে গিয়েই আবার উলটো নেমে যেতাম সঙ্গে সঙ্গে। মাঝে মাঝে ঢালে উঠে নেমে থেমে থেকে আড়াআড়ি সড়কে দূরপানে চেয়ে দেখতাম। নদীর মতোই অনেক দূরে যেতে যেতে একসময় পুবে-পশ্চিমে দুই দিকেই বাড়িঘর আর সারিসারি গাছপালার মধ্যে মিশে গেছে সড়কটা। ওই পথেই দৈনিক আব্বু অফিসে যেতেন। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে সাইকেল নিয়ে আব্বুর পিছু ধাওয়া করতাম, ওই ঢাল পর্যন্ত। তারপর আব্বু মোটরবাইকের দ্রুমদ্রুম আওয়াজ করতে করতে সড়কের সাথে মিশে যেতেন একসময়। সেদিকে চেয়ে চেয়ে দেখার পর ঢাল থেকে আবার নেমে আসতাম। ওঠার সময় কষ্ট হলেও নামার সময় ছিলো একেবারেই সহজ, কেবল হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকো কোনোমতে। সাইকেলই গড়গড়িয়ে নেমে আসতো ঢাল থেকে অনেকদূর, অনেকক্ষণ ধরে; উপরে থেকে গড়িয়ে পড়া পানির স্রোতের মতো।
সিটে উঠে সাইকেল চালানো শিখি অনেক পরে। আমার চাচাতো ভাইয়ের একটা “চায়না-ফনিক্স” ছিলো, মূলত ওইটাতে আমি সিটে চড়া শিখি ভালোমতো। সাইকেল চালাতে পারলেও আমি চালানোর নিয়ম কানুন অনেকদিন পর্যন্ত কিছুই জানতাম না। যেমন রাস্তার কোনপাশ দিয়ে চালাতে হবে, কীভাবে ব্রেক করার আগে পেছনে সংকেত দিতে হবে, কিভাবে মোড়ে ঘুরতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আব্বু বা অন্যদের নিয়মিতই দেখেছি রাস্তার বামপাশ দিয়ে চালাতে, কিন্তু এইটাই যে নিয়ম তা আমার জানা ছিলো না তখন। আমার ধারণা ছিলো, উনারা ইচ্ছা করে বাম দিক দিয়ে চালান। আর তাই আমি দিকের তোয়াক্কা না করে সেইসময় ইচ্ছেমতো কখনও বামে, কখনও ডানে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাস্তার মাঝ বরাবর ছুট দিতাম।
হিরো-জেট জীবন
আমার প্রথন সাইকেল আমি উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম, মেজো মামার কাছে থেকে। সেইটা ক্লাস সিক্সে ওঠার সময়, কথা ছিলো ক্লাস ফাইভে আমি ভালো রেজাল্ট করলে মামা আমাকে একটা সাইকেল গিফট দেবেন। সাইকেল পাওয়ার সংগ্রামে কিংবা বন্ধুদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রেই কিনা কেজানে, ধুম করে ক্লাস সিক্সে ফার্স্ট হয়ে গেলাম! এবং তার কিছুদিন পরেই মামা পাঠিয়ে দিলেন পলিথিনে মুড়িয়ে লাল টকটকে মাঝারি সাইজের একখান “হিরো-জেট”। কী সাইকেল নিবো এইটা মামাই ঠিক করতে বলেছিলেন আমাকে। চারিদিকে তখন “চায়না-ফনিক্স”-এ ছড়াছড়ি। এর মাঝে স্কুলে দেখি আমার এক বন্ধুর একটু অন্যরকম সাইকেল, দেখতে বেশ সুন্দর। সবচেয় বড় কথা এইটা আমাদের শরীরের সাথে মানানসই। বেশি বড়ও না, বেশি ছোটও না। ওইটা দেখে পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো। আর তাই ঐটারই নাম দিয়েছিলাম মামার কাছে।
এই সাইকেলটা আমার কৈশোরের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। ঐ সময় আমরা দাদুবাড়ি ছেড়ে স্কুলের কাছে চলে আসি, বাসাভাড়া নিয়ে। স্কুলে হেঁটে যেতে দশমিনিট। তাও প্রায়ই স্কুলে সাইকেল নিয়ে যেতাম। খেলার ফাঁকে বা সময় পেলেই সাইকেল নিয়ে চলমান আড্ডা শুরু হয়ে যেতো বন্ধুদের সাথে। এইসময় আর আম্মুর নিষেধ ছিলো না। একেবারে রাজপথে চালাতাম সাইকেল। যারা দূর থেকে সাইকেল নিয়ে আসতো, তাদের দেখে মনে হতো ইশ! আমার বাসা আরেকটু দূরে যদি হতো। তাইলে আরও বেশি বেশি চড়ে আসতাম। আরও বেশি করে সাইকেল চালাতে চালাতে গল্প করা যেতো সবার সাথে।
মাঝে মাঝে আমাদের মাঝে হতো প্রতিযোগিতা, কে জেতে। আমার মতো হাতে গোনা কয়েকজনের মাঝারি সাইজের সাইকেল ছিলো, বাকিদের ফনিক্স। ফলে জিততে আমাদের বেশ বেগ পেতে হতো। কেননা সাইকেল বড় হলে যে চালিয়ে যেতে এবং গতিতে মজা তা তখন টের পেয়েছিলাম। তবে এটা নিয়েও রেসে আমি হেরেছি খুব কম। ছোটার সময় কারও হুশ থাকতো না। সীমানা আগেই বলা থাকলেও হয়তো দেখা যেতো ছুটতে ছুটতে আরও বহুদূর চলে গেছি।
তবে রাজপথে জোরে না, আস্তে আস্তে হেলেদুলে সাইকেল চালাতে বেশি মজা। কেবল ট্রাক-বাস না থাকলে নিজেকেই পথের রাজা মনে হয়। আরেকটা ব্যাপার হলো, বিটুমিনের রাস্তায় কেনোজানি সাইকেলের আসল মজা পেতাম না, এখনও পাই না। সাইকেলের আসল মজা মাটির রাস্তায়, গ্রামের পথে। দাদুবাড়ি ঘুরতে যাওয়ার সময় কিংবা বাসার আশেপাশে চালানোর সময় এই মজাটা পেতাম। কেমন একটা মৃদুছন্দে দুলতে দুলতে এগিয়ে যায় এবড়ো-থেবড়ো মাটির সাথে ঘষে ঘষে, অনুভূতিটাই অন্যরকম। আর চালানোর সময় অনেকরকম কারিগরি করা, সবই মনের আনন্দে। কখনও শুরুতেই হঠাৎ হুট করে তীব্র বেগে প্যাডেল ঘুরিয়ে তারপর আরামসে ছেড়ে দিতাম পা। চাকার সাথে প্যাডেলও বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকতো সমানে। আবার কখনও সাইকেলের বেগ একটু বাড়িয়ে নিয়ে তারপর উলটা দিকে প্যাডেল ঘুরাতাম। এইটাও মজার, যেনো আমি চালাচ্ছি পেছনে, অথচ সাইকেল যাচ্ছে সামনে। আর সাথে চেইন উলটো ঘুরানোর রিরিরিরি শব্দ; পুরোই অদ্ভুত।
উঠতি বয়সে ভাবের শেষ থাকে না। সেরকম আরেকটা ভাব ছিলো পেছনের ক্যারিয়ারে বসে চালানো। হুদাই মুখে উদাস উদাস একটা ভাব এনে ক্যারিয়ারে বসে আরামে প্যাডেল ঘুরাতাম মাঝে মাঝে। আম্মু দেখে বলতো, বাপরে স্টাইল!!! আবার কখনও আমির খানের মতো দুই হাত ছেড়ে দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে চালানো। আমি চুল না আঁচড়ালেও হাত ছেড়ে দিয়ে অনেক চালিয়েছি। অবশ্য বেশিদূর যেতে পারতাম না। তাও আমার কেরামতি দেখে কে? সাইকেল চালানোর আরেকটা বিশাল স্টাইল ছিলো এটাতে আরোহন পদ্ধতি। সাধারণত সবাই সিটে চড়ে বসে তারপর চালানো শুরু করে। আমাদের মধ্যে এ নিয়ে হতো প্রতিযোগিতা। কে কত বিচিত্র এবং ভাবযুক্ত উপায়ে সাইকেলে আরোহন করতে পারে চালানোর আগে তা নিয়ে। কেউ বাম দিকে দিয়ে, কেউ ডানপাশ দিয়ে, কেউ কিছুদূর দৌড়ে নিয়ে লাফিয়ে, কেউ আবার দুই পা-ই একপাশে ঝুলিয়ে ইত্যাদি বহুরকম কারসাজি দেখাতো। আমি অবশ্য এইটার কৌশল বেশিরকম পারতাম না। আমি সিটে চড়ে বসেই চালাতাম বা চালাই বেশি।
আমার সাইকেল চালানোর জায়গা ছিলো মূলত আশেপাশে গ্রাম্য কাঁচারাস্তা, স্কুলের মাঠ, দাদুবাড়ির রাস্তা, বাজারের রাস্তা আর প্রধান রাজপথ। এইগুলোতেই ঘুরে ফিরে সাইকেলে চড়ে কেটে গেছে আমার অসংখ্য বিকেলবেলা। প্রতিদিন একইরকম, অথচ প্রতিদিনই নতুন, অনাবিল আনন্দদায়ী। সাইকেল নিয়ে চেনা পথেই নিত্য আমি নেমে যেতাম হারিয়ে যেতে, হারিয়ে গিয়ে।
অতঃপর
আজকেই আবার আরেক বন্ধুবর কেয়া ম্যাডামের সাথে কথা বলে জানলাম, তিনি সাইকেল কিনেছেন। আবাসস্থান অর্থাৎ কোয়ার্টারে চালাবেন বলে। আশরাফের কথায় মাথা নিরেট হয়ে গিয়েছিলো স্মৃতিতে। কেয়ার সাইকেলের কথা শুনে সেই নিরেট মাথার মধ্যে স্মৃতিগুলো গুলিয়ে গুলিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে সামনে আসতে থাকলো একে একে। নিতান্ত তুচ্ছ, নগন্য; অথচ কত জীবন্ত সেসব এক একটি দিন, এক একটি ছেলেবেলা। আমার এক একটি সাইকেল বেলা। সেই সাইকেলটি বাসায় এখনও আছে। ওর পিঠে চড়ে কেটে গেছে আমার কৈশোর, আমার ছোট দুই ভাইয়েরও কৈশোর। এখনও আমরা সেটা চালাই। এখনও সেটা সময় কাটিয়ে যাচ্ছে তার চিরচেনা বন্ধুদের সাথে।
(নভেম্বর ৪, ২০১২)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন